সোমবার, 28 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

সিঁড়ি বেয়ে ওঠার অভ্যাস: হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো থেকে সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি

বহুতল ভবনে লিফট ছাড়াই চার-পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে ওঠা দৈনন্দিন জীবনের এক ক্লান্তিকর কাজ মনে হলেও, এটি আপনার স্বাস্থ্যের জন্য অবিশ্বাস্যরকম উপকারী। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে এবং সামগ্রিক সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করে।

শেয়ার করুন:
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার অভ্যাস: হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো থেকে সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি

দৈনন্দিন জীবনে বহুতল ভবনে বসবাসকারী অনেকের কাছেই লিফট ছাড়া সিঁড়ি বেয়ে চার-পাঁচতলায় ওঠানামা এক চ্যালেঞ্জিং কাজ। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ বা অফিসের দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি শেষে যখন সিঁড়ির সামনে দাঁড়াতে হয়, তখন এই আপাত কষ্টকর প্রক্রিয়াটি বিরক্তির কারণ হতে পারে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই দৈনন্দিন অভ্যাসটি কেবল শারীরিক পরিশ্রমই নয়, বরং সুস্বাস্থ্যের এক দারুণ উপায়, যা আপনার হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার কেবল পেশিশক্তিই বাড়ায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও সক্ষম।

যুক্তরাজ্যের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। নরফোক অ্যান্ড নরউইচ ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল এবং ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার গবেষকরা ৪ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাঁদের গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিতভাবে সিঁড়ি ব্যবহার করেন, তাঁদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক কম। এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি বিশ্বখ্যাত ‘আমেরিকান জার্নাল অব কার্ডিওভাসকুলার ড্রাগস’-এ প্রকাশিত হয়েছে, যা এর নির্ভরযোগ্যতাকে আরও দৃঢ় করে।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, যাঁরা নিয়মিত সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করেন, তাঁদের হৃদরোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৩৯ শতাংশ কমে যায়। শুধু তাই নয়, যেকোনো কারণে মৃত্যুর সামগ্রিক ঝুঁকিও ২৪ শতাংশ হ্রাস পায়। এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিসংখ্যান, যা নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরে। এছাড়া, তাঁদের হার্ট ফেইলিউর, স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য গবেষকরা ৩৫ থেকে ৮৪ বছর বয়সী ব্যক্তিদের ওপর পরিচালিত পৃথক ৯টি গবেষণার তথ্য একত্রিত করে বিশ্লেষণ করেছেন এবং অংশগ্রহণকারীদের গড়ে ১৪ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার গবেষণার ফলাফলকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

তবে ঠিক কতবার সিঁড়ি ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যায়, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। যদিও একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে অন্তত ছয়বার সিঁড়ি বেয়ে উঠলে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। গবেষণার প্রধান লেখক সোফি প্যাডক জোর দিয়ে বলেছেন, যত বেশি সিঁড়ি বেয়ে ওঠা যায়, স্বাস্থ্যের জন্য তা তত বেশি উপকারী। এমনকি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিঁড়ি ব্যবহারের অভ্যাসও শরীরের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত সুবিধা এনে দেয়। এই ছোট ছোট অভ্যাসকে গবেষকরা ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকস’ বলে অভিহিত করেছেন, যা শরীরের শক্তি বাড়ায়, হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে এবং ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও দারুণ কার্যকর।

এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা উল্লেখ করা প্রয়োজন। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা কতবার সিঁড়ি ব্যবহার করেছেন, তা তাঁরা নিজেদের স্মৃতি থেকে জানিয়েছেন, ফলে তথ্যে কিছু ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া, যাঁরা নিয়মিত সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করেন, তাঁরা হয়তো এমনিতেই স্বাস্থ্যসচেতন এবং সক্রিয় জীবনযাপন করেন। তাই শুধুমাত্র সিঁড়ি ব্যবহারের কারণেই তাঁদের হৃদরোগের ঝুঁকি কমেছে, নাকি তাঁদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার প্রভাব রয়েছে, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকতে পারে। গবেষক সোফি প্যাডকের মতে, যাঁরা নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার করেন, তাঁরা সাধারণত বেশ চটপটে থাকেন এবং অন্যদের চেয়ে তাঁদের ফিটনেস বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

যদি আপনি নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহারে অভ্যস্ত না হন, তবে শুরুতেই চার-পাঁচতলা ওঠা আপনার জন্য নিরাপদ না-ও হতে পারে। মেয়ো ক্লিনিক স্পোর্টস মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ কার্ল এরিকসন পরামর্শ দেন, শরীরের ওপর নতুন কাজের চাপ পড়লে শরীর এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তাই ধীরে ধীরে সিঁড়ি ব্যবহারের সক্ষমতা ও পেশিশক্তি বাড়াতে প্রতিদিন অল্প করে সিঁড়ি ব্যবহার শুরু করা উচিত। প্রথমে একতলা দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে অভ্যাস বাড়ানো যেতে পারে। মেট্রো স্টেশন বা শপিং মলে চলন্ত সিঁড়ি বা এস্কেলেটর ব্যবহার না করে সাধারণ সিঁড়ি ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে, রাস্তা পার হওয়ার সময় ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করলেও তা এক ধরনের কার্যকর ব্যায়াম হিসেবে গণ্য হবে।

তবে কিছু শারীরিক জটিলতা থাকলে সিঁড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। যদি সিওপিডি (COPD) বা ফুসফুসের জটিল কোনো রোগ থাকে, তবে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিল হেলথের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ক্যাথরিন পোলগিয়ার্স সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর যদি বুকে ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা কিংবা তীব্র মাথাব্যথা হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। সব মিলিয়ে, সক্রিয় জীবনযাপন হৃদযন্ত্রকে ভালো রাখতে এবং হাড় ও পেশি শক্তিশালী করতে দারুণ কাজ করে। তাই দৈনন্দিন জীবনে সিঁড়ি ব্যবহারের মতো সাধারণ অভ্যাসকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পেতে পারি।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ