সোমবার, 28 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

পুকুরের পরিত্যক্ত ডিম থেকে জন্ম, এক বছর পর পরিবারের আদরের মোরগ চুচুর জন্মদিন উদ্‌যাপন রাজশাহীতে

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ গ্রামে এক ব্যতিক্রমী জন্মদিনের আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া ডিম থেকে অলৌকিকভাবে জন্ম নেওয়া মোরগ ‘চুচু’ তার প্রথম জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছে পরিবারের সদস্যদের সাথে। এই অনন্য কাহিনি মানব-প্রাণী সম্পর্কের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যেখানে একটি মোরগ পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

শেয়ার করুন:
পুকুরের পরিত্যক্ত ডিম থেকে জন্ম, এক বছর পর পরিবারের আদরের মোরগ চুচুর জন্মদিন উদ্‌যাপন রাজশাহীতে

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ গ্রামে সম্প্রতি এক বিরল ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয়রা। বাড়ির পাশের মজা পুকুরে ফেলে দেওয়া একটি ডিম থেকে অলৌকিকভাবে জন্ম নেওয়া মোরগ ‘চুচু’ তার প্রথম জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছে। গত রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) আব্দুল হাদীর বাড়িতে আয়োজিত এই জন্মদিন অনুষ্ঠানে কেক কেটে এবং মিষ্টিমুখ করে চুচুর প্রথম বছর পূর্তি পালন করা হয়, যা মানব-প্রাণী সম্পর্কের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এই অসাধারণ কাহিনির সূত্রপাত হয়েছিল এক বছর আগে, যখন ছোট্ট নিশাত শবনম বাড়ির পাশের মজা পুকুরে ভাসতে থাকা পাঁচটি ডিম দেখতে পায়। খেলার ছলে একটি কাঠি দিয়ে ডিমগুলো কাছে টেনে বাড়িতে নিয়ে আসে সে। ডিমগুলো ভাঙতে গিয়ে একটির ভেতর পাওয়া যায় এক জীবন্ত ছানা, যার চোখ তখনো ফোটেনি। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ছানাটির যত্ন নেওয়া শুরু করেন এবং কিছুদিন পর সেটি ‘চু চু’ শব্দ করতে শুরু করলে তার নাম রাখা হয় ‘চুচু’। পরে জানা যায়, ছানাটি আসলে একটি মোরগ, কিন্তু তার আচরণ অন্য সাধারণ মোরগদের মতো নয়।

চুচু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এতটাই মিশে গেছে যে, তাকে পরিবারেরই একজন মনে করা হয়। বাড়ির কেউ তার নাম ধরে ডাকলেই সে সাড়া দেয়, ছুটে আসে এবং তাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। এই বিশেষ বন্ধনের কারণে চুচু এখন শুধু একটি মোরগ নয়, বরং আব্দুল হাদীর পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিশাতের বড় বোন সুজানা শবনম, যিনি সম্প্রতি স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন, চুচুর দেখভালের মূল দায়িত্ব পালন করেন। চুচুর জন্য বাড়িতে একটি ছোট্ট কাঠের ঘরও বানানো হয়েছে, যেখানে সে রাতে ঘুমায়।

চুচুর পছন্দের খাবারের তালিকায় রয়েছে নুডলস, চাল এবং কেক। অবাক করার বিষয় হলো, সে সাদা ভাত খেতে চায় না, কিন্তু পোলাওয়ের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও চুচু বেশ আগ্রহ নিয়ে কেকের টুকরা খেয়েছে। সুজানাদের বাড়িতে গিয়ে যখন আব্দুল হাদী ‘চুচু’ বলে ডাক দেন, তখন বাড়ির পেছন থেকে ‘কঁক কঁক’ শব্দ করে সাড়া দিয়ে সে ছুটে আসে। সুজানা তাকে কোলে তুলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলে চুচু মাথা নিচু করে সেই আদর উপভোগ করে, যা দেখে উপস্থিত সকলেই মুগ্ধ হন।

সুজানা শবনম জানান, ডিম ভেঙে জীবিত ছানাটি পাওয়ার পর দ্রুত তার মুখে পানি দেওয়া হয় এবং চোখ না ফোটা পর্যন্ত তুলার মধ্যে রেখে তার যত্ন নেওয়া হয়। এরপর পানি মিশিয়ে ফিড খাওয়াতে শুরু করেন তাঁরা। নিজের হাতে খাওয়ানোর কারণেই চুচুর সঙ্গে তাঁদের এমন গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। শুরুতে চুচু তাঁদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত এবং বিছানায় তাঁদের পাশেই ঘুমাত। পরে বয়স বাড়লে তার জন্য কাঠের ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে সে এখন রাতে ঘুমায় এবং ডাক দিলেই ভেতর থেকে সাড়া দেয়।

পরিবারের সদস্যরা চুচুর সঙ্গে ‘মোরগলড়াই’ও খেলে থাকেন। মুখের সামনে পা এগিয়ে দিলেই সে ঘাড়ের পালক ফুলিয়ে আক্রমণ করতে আসে। সুজানার চাচা মেহেরুল্লাহ বেশ কিছুক্ষণ চুচুর সঙ্গে এভাবে খেলেছিলেন এবং চুচুও যেন মোরগে-মোরগে লড়াইয়ের সময় যেমন উত্তেজিত হয়, তেমনই খেপে উঠেছিল। চুচুর এই স্বভাবের কথা আশপাশের লোকজনও জানেন এবং জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তাই স্বজনদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়ার মতো।

চুচুর জন্মদিনের জন্য কেক নিয়ে এসেছিলেন সুজানার চাচাতো বোন মেহেরুন্নেসা, যিনি রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। সঙ্গে ছিলেন তাঁর শাশুড়ি মমতাজ রহমান ও খালাশাশুড়ি দুলারী খাতুন। কেক কাটার সময় চুচুকে সুজানার কোলে বসানো হয়। সবাই একসঙ্গে ‘হ্যাপি বার্থডে, চুচু’ বলে উঠলে সুজানা কেক কাটেন। কেকের টুকরা চুচুর মুখের কাছে নিতেই সে ঝুঁটি ঝাঁকিয়ে বেশ আগ্রহ নিয়ে খেতে শুরু করে এবং এই দৃশ্য দেখে সবাই করতালিতে ফেটে পড়েন।

চুচুর জন্মের পেছনের গল্পটি জানা যায় সুজানার চাচি নূরজাহান বেগমের কাছ থেকে। তাঁর মুরগি ১২টি ডিম দিয়েছিল, যার মধ্যে সাতটি থেকে সময়মতো ছানা হয়েছিল। বাকি পাঁচটি ডিম থেকে ছানা না হওয়ায় মুরগিটিকে আরও দুই দিন বসিয়ে রাখার পর নূরজাহান ডিমগুলো বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দেন। সেই ফেলে দেওয়া ডিম থেকেই নিশাত ছানাটি পায়। কিছুটা বড় হলে সুজানা তাঁকে মোরগটি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আর নেননি। নূরজাহান বলেন, “ওরা কষ্ট করে ছানাটা বড় করেছে। তাই ওদের বললাম, তোমরা ওটা দিয়ে পিকনিক কইরো, না হয় যা খুশি তা-ই কইরো।”

তবে সেই ‘পিকনিক’ আর হয়নি। পুকুরে ফেলে দেওয়া ডিমের সেই ছানা এখন তাঁদের পরিবারেরই একজন। সুজানা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “চুচু যত দিন বাঁচবে, এ বাড়িতেই থাকবে। এত আদরের মোরগকে জবাই করতে পারব না, বিক্রিও করব না। চুচু এখন আমাদের পরিবারের একজন সদস্য।” এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা এবং যত্নের মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে এক অসাধারণ বন্ধন তৈরি হতে পারে, যা সামাজিক প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ