বরিশাল: প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বপ্ন আজও অধরা। নগরীর কাউনিয়া পুরানপাড়ার 'ময়লাখোলা' ডাম্পিং স্টেশনটি বিগত ২২ বছর ধরে নগরবাসীর, বিশেষ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য উন্মুক্তভাবে ফেলায় একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয়রা প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ, রোগবালাই ও নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার পর ২০০২ সালে ৬ একর জমির ওপর এই বর্জ্য ফেলার স্থানটি অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর ২০০৪ সাল থেকে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সমস্ত আবর্জনা এখানে ফেলা শুরু হলে এলাকাটি দ্রুতই 'ময়লাখোলা' নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় দুই দশক ধরে একই স্থানে বর্জ্য ফেলার কারণে এটি এখন বিশাল এক বর্জ্য পাহাড়ে পরিণত হয়েছে, যা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবকে প্রকটভাবে তুলে ধরে।
প্রতিদিন ২০০ টন বর্জ্য ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি) সূত্রে জানা গেছে, ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই শহরে প্রায় ছয় লাখ মানুষের বসবাস। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ টন গৃহস্থালির বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণের জন্য বিসিসির পরিচ্ছন্নতা শাখায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ৭২৬ জন কর্মী নিয়োজিত আছেন। তবে, ময়লা পরিবহনের জন্য মাত্র ২০টি ট্রাক ও ২২০টি বক্সভ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ক্রমবর্ধমান বর্জ্যের পরিমাণ সামাল দেওয়ার জন্য একেবারেই অপ্রতুল। আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ বা রিসাইক্লিং প্ল্যান্টের অভাবে সমস্ত বর্জ্য সরাসরি এই খোলা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলা হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ
ময়লাখোলার উন্মুক্ত বর্জ্য থেকে নির্গত বিষাক্ত তরল পদার্থ (লিচেট) পার্শ্ববর্তী সাপানিয়া খাল হয়ে সরাসরি কীর্তনখোলা নদীতে গিয়ে মিশছে। এর ফলে কীর্তনখোলা নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে, যা নদী ও এর জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এছাড়া, পলিথিন, কাগজ ও খাবারের উচ্ছিষ্টের স্তূপ থেকে সারা বছরই তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা চারপাশের বাতাসকে দূষিত করে। শীতকালে প্রায়শই এই বর্জ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ বাতাসে মিশে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তোলে।
স্থানীয়দের দুর্ভোগ ও সামাজিক প্রভাব
সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়লাখোলার মাত্র ৪০ গজ দূরেই কাউনিয়া হাউজিং প্রকল্প অবস্থিত, যেখানে প্রায় ৫০০ পরিবার বসবাস করে। এছাড়া, এই ভাগাড়ের চারপাশে প্রায় ৩ হাজার মানুষের বসতি রয়েছে। এর পাশেই ২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি কলেজসহ অন্তত ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১০-১২টি মসজিদ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই উন্মুক্ত ভাগাড়ের কারণে তারা শ্বাসকষ্ট (অ্যাজমা) জনিত রোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার হাফিজুর রহমান আকাশের বাণীকে বলেন, “গোটা নগরীর বর্জ্য এখন আমাদের এ এলাকায় ফেলা হচ্ছে। ভাগাড়টির চারপাশের আবাসিক এলাকার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া করে থাকছেন।” কাউনিয়া পুরানপাড়া এলাকার স্কুল ছাত্র শাহারিয়ার ইসলাম শুভ্র বলেন, “এ ভাগাড়ের দুর্গন্ধে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে। উটকো গন্ধে রাতে ঘুমাতেও পারি না। এটার কারণে এলাকায় কুকুর ও শুকরের উৎপাত বেড়েছে।”
শামীম হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, “ময়লাখোলার কারণে এলাকায় সারা বছরই মশা-মাছির উপদ্রব লেগে থাকে। শীতকালে যখন বর্জ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিষাক্ত ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে এখানে কোনো আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত বেড়াতে আসতে চায় না। দুর্গন্ধের কারণে নিজের বাড়িটি বিক্রি করে দেব, সেই উপায়ও নেই; কেউ বাড়ি কিনতে চায় না।”
প্রতিশ্রুতির পাহাড়, সমাধানের অভাব
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় ময়লাখোলাটি অন্যত্র স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। প্রায় ২২ বছর ধরে একই স্থানে বর্জ্য ফেলে নগরীর একটি বৃহৎ অংশের মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে রাখা হয়েছে, যা আধুনিক নাগরিক সুবিধা ও পরিবেশ সুরক্ষার ধারণার পরিপন্থী। নগরীর আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে, অথচ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি রয়ে গেছে সেই পুরোনো ও অস্বাস্থ্যকর।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের দ্রুত একটি আধুনিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবেশ দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।