নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের মানবিক সহায়তা বিতরণে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, পোগলা ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার স্ত্রী ও বেশ কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের নাম প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে অন্যায়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন, যেখানে তারা সুস্পষ্টভাবে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনেছেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত ৪ জুলাই, শনিবার, পোগলা ইউনিয়নের পাবই গ্রামের মো. নুরে আলমসহ ২৪ জন কৃষক স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্রে এই অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পোগলা ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুর আলম এবং নূর খান প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে নিজেদের পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের নাম সরকারি সহায়তার তালিকায় অন্যায়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কৃষকরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, সরকার যখন বিনামূল্যে সার, বীজ এবং বিভিন্ন কৃষি প্রণোদনা প্রদান করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এই ধরনের তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি প্রকৃত কৃষকদের তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এই কারণে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সহায়তা বিতরণের তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, গত ১৭ জুন হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির সহায়তা একযোগে বিতরণ করা হয়েছিল। এই সহায়তার আওতায় প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে নগদ ছয় হাজার টাকা এবং ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথা। সেই বিতরণের তালিকায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুর আলমের স্ত্রী শাহিনুর আক্তারের নাম সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি তালিকায় স্বামীর নামের পরিবর্তে তার বাবার নাম আবু সিদ্দিক ব্যবহার করেছেন, যা অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। এছাড়াও, শাহিনুর আলমের বড় ভাই রফিকুল আলমের স্ত্রী তৌহিদা খাতুনসহ তার নিকটাত্মীয় অন্তত ১৫ জনের নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুর আলমের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার দিক থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে, তার পক্ষ থেকে কয়েকজন ব্যক্তি এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য সবুজ মিয়া এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “শাহিনুর আলম একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়েও কৃষি প্রণোদনার তালিকায় তার স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা একেবারেই অনৈতিক। আমরা তার কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করি না।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “পোগলা ইউনিয়নের তালিকায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুর আলমের স্ত্রীর নাম থাকার বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। এই নামটি বাদ দিয়ে সেখানে প্রকৃত একজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুর আলমকে লেংগুরা ইউনিয়নে এবং নূর খানকে বড়খাপন ইউনিয়নে বদলি করা হয়েছে। এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ অনিয়মের বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছে এবং বিতর্কের মুখে পড়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
পোগলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, “অভিযোগের বিষয়টি আমরা শুনেছি এবং এটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যদি কোনো অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন এবং তাদের কাছে ন্যায্য সহায়তা পৌঁছায়।” উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, “অভিযোগ তদন্তে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনা হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং সরকারি সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যখন জীবন-জীবিকা নিয়ে সংগ্রাম করছেন, তখন এই ধরনের স্বজনপ্রীতি তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তোলে এবং সরকারের মহৎ উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই, তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম রোধ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ জনগণ।