সোমবার, 28 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

বরিশালের ভাইরাল ভিডিও: চুরির অভিযোগে মারধরের শিকার বাবার পুনর্বাসন, মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব প্রশাসনের

বরিশালের উজিরপুরে চুরির অভিযোগে মারধরের শিকার এক ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ভাইরাল ভিডিওতে বাবাকে রুটি খাইয়ে দেওয়া সেই মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্বও নিয়েছে প্রশাসন। বাবাকে পাঠানো হয়েছে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে।

শেয়ার করুন:
বরিশালের ভাইরাল ভিডিও: চুরির অভিযোগে মারধরের শিকার বাবার পুনর্বাসন, মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব প্রশাসনের

বরিশালের উজিরপুরে সম্প্রতি চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার ঘটনা এবং তার নয় বছর বয়সী মেয়ের বাবাকে রুটি খাইয়ে দেওয়ার হৃদয়স্পর্শী ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এই মর্মস্পর্শী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মারধরের শিকার ওই বাবাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তার মেয়ের পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে প্রশাসন। এই মানবিক উদ্যোগ পরিবারটির জন্য নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার দুপুরে ওই ব্যক্তিকে তার বাড়ি থেকে বরিশাল নগরের একটি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে, গত রবিবার বিকেলে উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা সশরীরে ওই ব্যক্তির বাড়িতে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানান। প্রশাসনের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওই ব্যক্তি নিরাময় কেন্দ্রে যেতে সম্মতি প্রকাশ করেন, যা তার এবং তার পরিবারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা এই প্রসঙ্গে বলেন, “পরিবারটিকে সুরক্ষা দিতে প্রথমে ওই ব্যক্তিকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যেই আমরা তাকে একটি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। সেখানে তিনি তিন মাস অবস্থান করবেন এবং তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার উপজেলা প্রশাসন বহন করবে।” এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশাসন পরিবারটির প্রতি তাদের গভীর সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রশংসিত হচ্ছে।

ভুক্তভোগী ব্যক্তির স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তার স্বামী ভালো মানুষ ছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বন্ধুদের প্ররোচনায় তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। গত শনিবারের ঘটনার পর তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং অনুতপ্ত। পরিবারের সদস্যরাও চান, তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন। স্ত্রীর বিশ্বাস, প্রশাসনের এই উদ্যোগ তাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর হবে এবং এর মাধ্যমে তারা একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারবেন। পারিবারিক পুনর্মিলন ও স্থিতিশীলতার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন তিনি।

গত শুক্রবার গভীর রাতে উজিরপুরের একটি বাজারে চুরির অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ওই ব্যক্তিকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন। পরের দিন শনিবার সকালে তার ৯ বছর বয়সী মেয়ে বাবার এই দুরবস্থার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। সেখানে উপস্থিত লোকজনের কাছে সে তার বাবাকে আর মারধর না করার জন্য আকুতি জানায়। একপর্যায়ে ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি খুঁটির সঙ্গে বাবার পা বাঁধা রয়েছে এবং তার হাতে একটি চায়ের কাপ। মেয়েটি পাউরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে চায়ে ভিজিয়ে পরম মমতায় বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক জনতা বিভিন্ন কথা বলছিলেন আর মেয়েটি অসহায় দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাচ্ছিল। এই দৃশ্যটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

এই মর্মস্পর্শী ঘটনাটি গত শনিবার প্রথম আলোসহ দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দেশ-বিদেশের অসংখ্য ব্যক্তি শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর এবং পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই ব্যাপক জনসমর্থন এবং গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, যা একটি সামাজিক সংবেদনশীলতার উদাহরণ তৈরি করেছে।

উপজেলা প্রশাসন কেবল বাবার পুনর্বাসনেই থেমে থাকেনি, বরং পরিবারটির সার্বিক সুরক্ষার জন্য একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইউএনও মো. আলী সুজা সোমবার রাতে আরও জানান, ওই ব্যক্তির স্ত্রীর জন্যও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে যাতে পরিবারটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। এছাড়াও, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি এবং উপজেলা প্রশাসনের আর্থিক সহায়তা মিলিয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটির পড়াশোনা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ লক্ষ্যে তার মায়ের নামে একটি স্থায়ী আমানত (Fixed Deposit) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন সুরক্ষিত করবে এবং তাকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আশা করি, সম্মিলিত উদ্যোগে আমরা এই পরিবারটিকে সুরক্ষা দিতে পারব এবং তাদের একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারব।” এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কেবল একটি ঘটনার সমাধান নয়, বরং এটি সমাজের দুর্বল অংশের প্রতি প্রশাসনের দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ