প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ফার্মাসিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বিশেষ দিনে যখন বিশ্বব্যাপী ওষুধের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়, তখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফার্মাসিস্টদের প্রাপ্য সম্মান ও তাদের পেশাগত সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। দেশের অনেক স্থানে এখনো একজন প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টের বদলে অদক্ষ দোকানদাররাই গুরুতর রোগের ওষুধ, এমনকি অ্যান্টিবায়োটিকও বিতরণ করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক এক ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার একটি ফার্মেসিতে একজন ক্রেতা ওষুধ কিনতে গিয়েছিলেন। এমন সময় ১০৪ ডিগ্রি জ্বর, শুকনা কাশি, গলা ব্যথা, ঠান্ডা, শ্বাসকষ্ট এবং বমি নিয়ে এক রোগী সেখানে আসেন। তিনি দোকানদারকে জানান যে কিছুদিন আগেও তার জ্বর হয়েছিল এবং তখন নেওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। চিকিৎসক দেখানো বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দোকানদার সেই রোগীকে মৌসুমি সমস্যা আখ্যা দিয়ে পাঁচ দিনের অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স, সঙ্গে কাশি ও ঠান্ডার ওষুধ ধরিয়ে দেন। রোগীও সন্তুষ্টচিত্তে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যান, যা একজন সচেতন নাগরিকের মনে গভীর প্রশ্ন তোলে।
এ ধরনের ঘটনায় দায় কার, সেই প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দেয়। ফার্মেসির দোকানদার যখন চিকিৎসক না দেখিয়ে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এতগুলো উপসর্গের ভিত্তিতে ওষুধ, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক বিতরণ করেন, তখন একজন পেশাদার ফার্মাসিস্টের দীর্ঘদিনের পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দোকানদার তার কাজের কারণ হিসেবে ডাক্তার দেখানোর সময় ও সুযোগের অভাবকে তুলে ধরেন, কিন্তু প্রায়শই তথাকথিত 'মডেল ফার্মেসি'গুলোতেও প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টদের অনুপস্থিতি দেখা যায়, যা কেবল সরকারি পরিদর্শনকালে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
প্রকৃতপক্ষে, একজন ফার্মাসিস্টের কাজ কেবল ওষুধ বিক্রি করা নয়। ফার্মেসি শিক্ষা একজন পেশাজীবীকে ওষুধের গুণগত মান, নিরাপদ ব্যবহার, সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি, মাত্রা, ওষুধের পারস্পরিক ক্রিয়া, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে একজন ফার্মাসিস্ট রোগীর জন্য ওষুধের যুক্তিসঙ্গত ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। তাদের জ্ঞান ওষুধের নাম জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং জনস্বাস্থ্যে এর প্রভাব সম্পর্কেও তারা ওয়াকিবহাল থাকেন।
একটি ওষুধ রোগীর হাতে পৌঁছানোর আগে বহু জটিল ধাপ অতিক্রম করে। গবেষণা ও উন্নয়ন থেকে শুরু করে উৎপাদন, গুণগত নিয়ন্ত্রণ, গুণগত নিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়েই রয়েছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদনকালীন পরীক্ষা, বিভিন্ন পরীক্ষাগার পরীক্ষা, নথিপত্র তৈরি, ব্যাচ পর্যালোচনা এবং বাজারজাতকরণের অনুমোদন—প্রতিটি স্তরেই ফার্মাসিস্টদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা অপরিহার্য। তাই একজন ফার্মাসিস্টের সম্ভাবনা কেবল ওষুধ শিল্পে চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য।
কমিউনিটি ফার্মেসি এবং হাসপাতাল ফার্মেসি একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে, যদি সেখানে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টদের কার্যকর সম্পৃক্ততা থাকে। একজন প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীকে ওষুধ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম, সময় ও মাত্রা, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কে বিস্তারিত সহযোগিতা করতে পারেন। এটি বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ভুল ব্যবহার মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার, যেমন—প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার করা, ভুল মাত্রায় ব্যবহার করা অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার ব্যবহার করা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বৈশ্বিক হুমকি। তাই অ্যান্টিবায়োটিকসহ সব ধরনের ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, নার্স, রোগী এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। এই সমন্বিত উদ্যোগই কেবল ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে পারে।
আমরা যখন সামান্য মূল্যের একটি ওষুধ কিনি, তখন হয়তো কখনো ভাবি না যে এই ওষুধটি আমাদের হাতে পৌঁছানোর আগে কতগুলো ধাপ অতিক্রম করেছে। একটি ছোট ট্যাবলেটের পেছনেও রয়েছে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত শ্রম, জ্ঞান, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা। প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পরই একটি ওষুধ বাজারজাতকরণের অনুমোদন পায়, যা রোগীর জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করাও ফার্মাসিস্টদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসকে কেবল ফুল, পোস্টার, সেমিনার কিংবা শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ফার্মাসিস্টদের পেশাগত সক্ষমতাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। কমিউনিটি ফার্মেসি ও হাসপাতাল ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টদের কার্যকর সম্পৃক্ততা বাড়ানো গেলে ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, রোগীর ওষুধ-ব্যবহার বিষয়ক পরামর্শ আরও কার্যকর হবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা শক্তিশালী হবে। এর মাধ্যমে ফার্মাসিস্টরা তাদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা ফিরে পাবেন এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ হবে।