বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে একটি নতুন এবং সমন্বিত কাঠামো চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি ঘোষিত এই ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন পদ্ধতি এমডিদের পারফরম্যান্স, ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর ভিত্তি করে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক যেমন – নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং বেতন-ভাতা ও প্রণোদনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি এমডির কর্মদক্ষতা ছয় মাস অন্তর মূল্যায়ন করা হবে। বর্তমানে দায়িত্বে থাকা এমডিদের ক্ষেত্রে প্রথম মূল্যায়নকাল ধরা হয়েছে আগামী অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। ভবিষ্যতে নতুন কোনো এমডি নিয়োগ হলে, তার দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী ছয় মাসের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। এর ফলে, প্রতিটি এমডির কর্মজীবনের শুরু থেকেই তার পারফরম্যান্স একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডে পরিমাপ করা সম্ভব হবে, যা ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এমডিদের কর্মদক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক ও পরিচালন পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে মোট ১০০ নম্বরের একটি অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়ন করেছে। এই কাঠামোতে পূর্ববর্তী প্রান্তিকের পারফরম্যান্সকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য সংশ্লিষ্ট সূচকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর সাত কার্যদিবসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো কার্যকর বলে বিবেচিত হবে, যা স্বচ্ছতা ও কেন্দ্রীয় তদারকি নিশ্চিত করবে।
নতুন মূল্যায়ন কাঠামোতে মোট পাঁচটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, জরুরি পরিস্থিতিতে তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং যেকোনো ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতার জন্য রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর। একই পরিমাণ অর্থাৎ ২৫ নম্বর রাখা হয়েছে খেলাপি ঋণ (NPL) কমানো, অবলোপন করা ঋণ আদায় এবং শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে ঋণের কেন্দ্রীভবন নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর। এই দুটি ক্ষেত্র ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য এবং স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই এগুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এছাড়াও, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন সংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে আরও ২৫ নম্বর। বাকি ১৫ নম্বর রাখা হয়েছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ব্যাংকের ভূমিকার জন্য, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (CMSME) ও কৃষিঋণ বিতরণ, গ্রিন ফাইন্যান্সের প্রসার, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার উন্নয়ন, বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা। এই বিষয়গুলো ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আধুনিক ব্যাংকিং সেবা বিস্তারে গুরুত্ব বহন করে।
অবশিষ্ট ১০ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে ব্যাংকের মুনাফা অর্জন এবং পরিচালন ব্যয়ের দক্ষতার ওপর, যা ব্যাংকের বাণিজ্যিক সাফল্য এবং ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নির্দেশ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, প্রতিটি নির্ধারিত সূচকে এমডিদের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। যদি কোনো সূচকে এমডির অর্জন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে তিনি সেই নির্দিষ্ট সূচকে কোনো নম্বর পাবেন না, যা প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করবে।
গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বিশেষ সূচকে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ঋণ-আমানত অনুপাত, খেলাপি ঋণের অনুপাত, ঋণ আদায় এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে কোনো এমডি ৫০ শতাংশের কম অর্জন করলে বা শূন্য পেলে, তার মোট অর্জিত নম্বর থেকে নির্দিষ্ট হারে পেনাল্টি কেটে নেওয়া হবে। এই কঠোর ব্যবস্থা এমডিদের ওপর বিশেষ চাপ সৃষ্টি করবে যাতে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে কোনোভাবেই ব্যর্থ না হন।
সামগ্রিক মূল্যায়নে এমডিদের পারফরম্যান্সকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যদি কোনো এমডি ৭৫ বা তার বেশি নম্বর অর্জন করেন, তাহলে তার কর্মদক্ষতাকে 'গড়পড়তার চেয়ে ভালো' হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম নম্বর পেলে তা 'গড়পড়তা' পারফরম্যান্স হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কোনো এমডির অর্জিত নম্বর ৬৫-এর নিচে হয়, তবে তার কর্মদক্ষতা 'নিম্নমানের পারফরম্যান্স' হিসেবে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বাস করে, এই অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতা আরও স্পষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে, যা দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।