জাতীয় সংসদে ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং পরে তা কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়। এই সংশোধনী বিলের মাধ্যমে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদে বিল উত্থাপনকালে জানান যে, সংকটে থাকা তফসিলি ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনের জন্য একটি বাজারভিত্তিক বিকল্প কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্যে ১৮(ক) ধারাটি পূর্বে যুক্ত করা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট মোকাবিলা করা, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকের অবসায়ন এড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থের ওপর চাপ কমানো। এই ধারাটির মাধ্যমে সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই পুনর্গঠনের একটি পথ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে, ধারাটিতে যোগ্য ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কঠোর কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী সংসদে উল্লেখ করেন যে, আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি, শেয়ারহোল্ডার বা প্রতিষ্ঠান ওই সব শর্ত পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, ধারাটির মূল উদ্দেশ্য বাস্তবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং এর কার্যকারিতা না থাকায় সরকার এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই বিল অনুযায়ী, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারাটি সম্পূর্ণভাবে রহিত হবে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশে ১৮(ক) ধারাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অধ্যাদেশটি সংশোধন করে আইন হিসেবে অনুমোদনের সময় এই ধারাটি যুক্ত করা হয়। ধারাটি যুক্ত হওয়ার পর থেকেই এটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, এই ধারার মাধ্যমে রেজোল্যুশনের আওতায় নেওয়া কোনো ব্যাংকের সাবেক বা বিতর্কিত পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডাররা পুনরায় ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারেন, যা ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের পরিপন্থী হবে।
বিতর্কিত এই ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশন প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে ওই ব্যাংকের শেয়ার ধারণকারী শেয়ারহোল্ডাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পুনরায় ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় অধিগ্রহণের জন্য আবেদন করার সুযোগ পেতেন। একই সুযোগ অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের প্রক্রিয়ায় সাবেক পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় এলে ১৮(ক) ধারাটি বিশেষভাবে জনদৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এর বিলোপের দাবি জোরালো হয়।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে এই ধারা বাতিলের জন্য ব্যাপক সমালোচনা ও চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাদের যুক্তি ছিল, এই ধারাটি নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং অসাধু ব্যক্তিরা তাদের অপকর্মের পর পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। এই সমালোচনার মুখে সরকার ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়, যা সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আইন কার্যকর হওয়ার পর নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ধারাটি বাতিল করাই যথাযথ ও সময়োপযোগী। এই সংশোধনী ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যতে সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। এটি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং জনমানুষের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের এই সংশোধনী দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে, বিশেষত যখন ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়।