সোমবার, 14 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
ব্যাংকিং 🇧🇩 বাংলা

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড ১২ হাজার কোটি টাকা আয়

গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে রেকর্ড পরিমাণ ১২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা সুদ আয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত তিন অর্থবছরের মধ্যে এটিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ বৈদেশিক বিনিয়োগ আয়, যা মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি সুদহারের কারণে সম্ভব হয়েছে।

শেয়ার করুন:
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড ১২ হাজার কোটি টাকা আয়

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ১২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা সুদ আয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, এই অর্জন বিগত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি সুদহার এবং কুপন রেটের কারণে এই উল্লেখযোগ্য আয় বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে এই আয় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং সরকারের কোষাগারে অর্থ প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈদেশিক বন্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি নোটে বিনিয়োগ থেকে গত অর্থবছরে ৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকা সুদ আয় হয়েছে। এছাড়াও, বিদেশি ব্যাংকগুলোতে রাখা ঋণ ও আমানত থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এসেছে। এর মধ্যে, ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ঋণ থেকে ২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি আমানত থেকে ২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা আয় পাওয়া গেছে। অন্যান্য বৈদেশিক সম্পদ থেকে প্রায় ৮৭১ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা মোট বৈদেশিক বিনিয়োগ আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আয়ের এই উল্লম্ফন পূর্ববর্তী বছরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রায় থাকা আর্থিক সম্পদ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় হয়েছিল ৭ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। তারও আগে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৬ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক বিনিয়োগ থেকে আয়ের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনুকূল পরিবেশকে প্রতিফলিত করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সরকারি বন্ড, সিকিউরিটিজ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানত হিসেবে বিনিয়োগ করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক সুদহার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় এসব বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত রিটার্ন বা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৈশ্বিক প্রবণতার সুফল পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকও, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে রেকর্ড পরিমাণ আয় সম্ভব হয়েছে।

বৈদেশিক বিনিয়োগের পাশাপাশি, বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণ খাত থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় করে থাকে। সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত অর্থবছরে ২২ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা আয় করেছে। এর মধ্যে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে সুদ হিসেবে এসেছে ২১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা, যা অভ্যন্তরীণ আয়ের সিংহভাগ। এই আয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

অভ্যন্তরীণ আয়ের অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে কমিশন ও ডিসকাউন্ট থেকে ৪৩১ কোটি টাকা, লভ্যাংশ হিসেবে ২০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৪৭৫ কোটি টাকা। তবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ খাতের আয় ছিল আরও বেশি, ২৪ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছরের পুরো সময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিসুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়েছিল। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে অর্থ নিতে হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুদ আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। বিভিন্ন পরিচালনাসহ অন্যান্য খরচ বাবদ ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা বাদ দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এটি আগের অর্থবছরের ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকার নিট মুনাফার চেয়ে ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা বেশি, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও লাভজনকতার প্রমাণ বহন করে।

জানা গেছে, গত অর্থবছরের নিট মুনাফার পুরো ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকাই সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এবং বাকি ১৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা সম্প্রতি জমা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ