দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংক গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। এই অভিনব ব্যবস্থায় প্রচলিত সুদভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ফি পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহকরা তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন বিল ও সেবার মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাবেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে, যেখানে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংককে এই ই-পেমেন্ট ক্রেডিট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ই-পেমেন্ট ক্রেডিটের আওতায় গ্রাহকরা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন জরুরি সেবা ও বিল পরিশোধের সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সকল ইউটিলিটি বিল, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা বাবদ ফি, টোল ও বিভিন্ন পরিবহন টিকিটের মূল্য। এছাড়াও, কর ও অন্যান্য সরকারি ফি, ব্যাংক আমানতের কিস্তি এবং বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধ করা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য খরচও এই সুবিধার আওতাভুক্ত করা যাবে, যা দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনকে আরও সহজ করে তুলবে।
এই ই-পেমেন্ট ক্রেডিটের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সুনির্দিষ্ট ফি কাঠামো নির্ধারণ করেছে। ঋণের পরিমাণ এবং মেয়াদ অনুসারে এই ফি প্রযোজ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ, ৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ৭ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৩ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৪ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ৬ টাকা ফি নেওয়া যাবে। এই ফি ব্যবস্থা গ্রাহকদের জন্য স্বচ্ছ ও পূর্বনির্ধারিত থাকবে, যাতে কোনো ধরনের লুকানো খরচ না থাকে।
অন্যদিকে, ৭ হাজার ১ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বড় অংকের ঋণের ক্ষেত্রে ফি কাঠামো ভিন্ন হবে। এক্ষেত্রে ৭ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৭০ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ১৩০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের মূল অর্থ এবং নির্ধারিত ফি যথাক্রমে ৮, ১৬ অথবা ৩১তম দিনের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করতে হবে। এই নির্দিষ্ট সময়সীমা গ্রাহকদের আর্থিক পরিকল্পনা সাজাতে সহায়তা করবে এবং অহেতুক জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে।
তবে, এই ই-পেমেন্ট ক্রেডিটের অর্থ গ্রাহকের হাতে সরাসরি নগদে দেওয়া হবে না। এর পরিবর্তে, নির্ধারিত সেবা প্রদানকারীর কাছে অনুমোদিত ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি বিল বা সেবার মূল্য পরিশোধ করা হবে। এই ঋণের অর্থ নগদে রূপান্তর, গ্রাহকের কোনো মোবাইল ওয়ালেটে জমা কিংবা অন্য কোনো ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের সুযোগ থাকবে না, যা এই সুবিধার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করবে। গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধ করতে চাইলে সেক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত ফি, সুদ, প্রি-পেমেন্ট, আর্লি সেটেলমেন্ট বা ফোরক্লোজার চার্জ নেওয়া যাবে না।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য দৈনিক ভিত্তিতে জরিমানা বা ফি নেওয়া হবে। তবে, এই জরিমানার পরিমাণও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে হবে, যাতে গ্রাহকদের উপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপে। ই-পেমেন্ট ক্রেডিট অনুমোদনের আগে গ্রাহককে ঋণের ধরন, পরিমাণ, ফি, মেয়াদ এবং পরিশোধের নিয়মসহ গুরুত্বপূর্ণ সব শর্ত স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। একই সঙ্গে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে।
ই-পেমেন্ট ক্রেডিট দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বিকল্প ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং পদ্ধতি ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রাহকের ঝুঁকি বিবেচনায় ঋণের সীমা নির্ধারণ করতে হবে। গ্রাহকের নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে ডিজিটাল অনবোর্ডিং সম্পন্ন করতে হবে এবং পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ওটিপি, টুএফএ, মাল্টিফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (এমএফএ) অথবা সমমানের নিরাপদ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। ই-পেমেন্ট ক্রেডিট কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকগুলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি), পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (পিএসও) এবং অন্যান্য ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সেবা চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে।
গ্রাহক ও ঋণসংক্রান্ত সকল তথ্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে থাকা ডেটা ওয়্যারহাউসে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি, এসব তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। উল্লেখ্য, ব্যাংকগুলো সরাসরি বাণিজ্যিকভাবে ই-পেমেন্ট ক্রেডিট চালু করতে পারবে না। এর আগে অন্তত ছয় মাস পাইলট ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পাইলট কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন করে ইতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এই সুবিধা চালু করা যাবে।