বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) অনুষ্ঠিত না হওয়ায় দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে যে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা অনস্বীকার্য। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে যে, এই তাৎক্ষণিক ক্ষতি অন্য কোনো উপায়ে পুরোপুরি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তাদের মূল লক্ষ্য এখন আর সাময়িক আর্থিক সহায়তা নয়, বরং দেশের প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ক্রিকেটারের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে কোয়াবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শেষে কোয়াবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিপিএল না হওয়ার কারণে যে বড় ধরনের আর্থিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করার জন্য নতুন কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং, জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল), বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) সহ অন্যান্য নিয়মিত ঘরোয়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক্রিকেটারদের আর্থিকভাবে আরও স্বাবলম্বী করার পথ খুঁজছে বিসিবি ও কোয়াব। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু বিপিএল-কেন্দ্রিক আয়ের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা এবং ক্রিকেটারদের জন্য একটি সুরক্ষিত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিসিবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে কোয়াবের প্রতিনিধি সাইফ হাসান বলেন, “বোর্ডের সঙ্গে আমাদের একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটারদের কতটা উপকার করতে পারি, সেই বিষয়গুলো নিয়েই মূলত কথা হয়েছে। বিপিএল যেহেতু এবার হচ্ছে না, নিঃসন্দেহে আমাদের একটি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তবে বিসিবি আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত ভালো এবং সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনা শুধু বিপিএলের খেলোয়াড়দের জন্য নয়, দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে জড়িত সকল খেলোয়াড়ের জন্যই উপকারী হবে। বোর্ড খুব শিগগিরই এই বিস্তারিত পরিকল্পনা জনসম্মুখে প্রকাশ করবে।”
বিপিএল না হওয়ার ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে নেওয়া হবে, এমন প্রশ্নে কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন স্পষ্ট করে জানান যে, এখনই সেই ক্ষতি পূরণ করার মতো বাস্তবতা নেই। তাদের মূল দাবি ছিল, বিপিএল না হলে ক্রিকেটারদের জন্য বোর্ড কী ধরনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, তা জানানো। সেই প্রেক্ষিতে বিসিবি একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করছে, যা দেশের ক্রিকেটের ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে। ক্রিকেটাররা স্বল্পমেয়াদী সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
বিপিএলের বিকল্প হিসেবে নতুন কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজিত হবে কিনা, সেই বিষয়েও মিঠুন পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, “প্রথমত, বিপিএল না হওয়ার কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার বিকল্প হিসেবে অন্য কিছু আয়োজন করে খেলোয়াড়দের সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা এখন নেই এবং সেটি হবেও না। বিপিএলের পরিবর্তে অন্য কোনো নতুন টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে না। বরং আমাদের যে নিয়মিত খেলাগুলো রুটিন অনুযায়ী হওয়ার কথা, যেমন এনসিএল বা বিসিএল, সেগুলোর মাধ্যমে খেলোয়াড়রা আর্থিকভাবে কতটুকু উপকৃত হতে পারে এবং কিভাবে তাদের আয় বাড়ানো যায়, সেই দিকটি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে।”
তবে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেবল কোয়াবের কয়েকজন কর্মকর্তার মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। ক্রিকেটারদের সংগঠনটি দেশের জাতীয় দলের অধিনায়ক এবং সকল সিনিয়র ক্রিকেটারের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেছে। এমনকি যারা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, তাদের সঙ্গেও টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এই সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ক্রিকেটারদের বৃহত্তর স্বার্থ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মোহাম্মদ মিঠুন আরও জানান, “শুধু কোয়াব নয়, আমরা জাতীয় দলের অধিনায়কদের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যারা এখন দেশে নেই, তাদের সঙ্গেও ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছে। সব বিস্তারিত আলোচনার পরেই আমরা বোর্ডের কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো পেশ করেছিলাম।” আলোচনার সময় ক্রিকেটারদের সামনে দুটি সুস্পষ্ট বিকল্প ছিল: একটি ছিল বিপিএল না হওয়ার কারণে সাময়িকভাবে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করা, আর অন্যটি ছিল এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা করা, যার সুফল আরও বেশি সংখ্যক ক্রিকেটার পাবেন এবং যা ভবিষ্যতের জন্য টেকসই হবে।
মিঠুন বলেন, “বোর্ড থেকে আমরা যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি, তাতে আমাদের কাছে দুটি বিকল্প পথ খোলা ছিল। একটি হলো বিপিএলের পরিবর্তে সাময়িকভাবে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করা, আর অন্যটি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তা করা, যার মাধ্যমে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ক্রিকেটার উপকৃত হবে। আমরা আমাদের সাদা বল ও লাল বলের অধিনায়ক এবং সকল সিনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।” শেষ পর্যন্ত সাময়িক আর্থিক সুবিধার প্রলোভন ত্যাগ করে, ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই এবং বিস্তৃত পরিকল্পনা গ্রহণের পক্ষেই মত দিয়েছেন ক্রিকেটাররা।
মিঠুন আরও বলেন, “আমরা শুধু ৫০-৭০ জন খেলোয়াড়ের কথা চিন্তা না করে, কিভাবে ১৫০-২০০ জন খেলোয়াড় ভবিষ্যতে উপকৃত হতে পারে এবং বিষয়টি যেন টেকসই হয়, সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই বছরের সাময়িক সুবিধার কথা চিন্তা না করে আমরা ভবিষ্যতের কথা ভেবেছি, যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড়রাও আরও বেশি উপকৃত হতে পারে এবং তাদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকে।” গত কয়েক বছর ধরে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের অনিয়মিত সূচি এবং পারিশ্রমিক পরিশোধে বিলম্বের কারণে ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। বিশেষ করে প্রিমিয়ার লিগ ও বিপিএলে নিয়মিত পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অনেক ক্রিকেটারের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোয়াব সভাপতির মতে, “গত ৫ বছর ধরে প্রিমিয়ার লিগ ও বিপিএল খুব অনিয়মিত হয়ে গেছে। কোভিডের পর থেকে এই খেলাগুলো এবং পারিশ্রমিক নিয়ে আমাদের অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আমাদের দাবি ছিল যেন আমাদের জীবিকা শুধু বিপিএল নির্ভর না হয়ে, ঘরোয়া ক্রিকেটের মাধ্যমে একটি সুসংহত ও টেকসই ব্যবস্থা পায়।”