চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ২৯ দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে মোট ২৬৬ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৮২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই প্রবাসী আয়, বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে, এক উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গত রোববার (৩০ আগস্ট) এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তার দেওয়া তথ্যমতে, রেমিট্যান্স প্রবাহে এই প্রবৃদ্ধি শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, বরং এর ধারাবাহিকতাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রবাসীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দেশের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসার ফলস্বরূপ এই বৃহৎ অঙ্কের অর্থ দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
চলতি বছরের আগস্টের ২৯ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাপক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে চলতি বছরে একই সময়ে এসেছে ২৬৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৩০ শতাংশ বা ৪৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং প্রবাসীদের আস্থার প্রতিফলন।
শুধুমাত্র মাসিক হিসাব নয়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স প্রবাহেও একটি ইতিবাচক চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এই সময়ে দেশে মোট ৫৫২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪৬৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ, অর্থবছরের শুরু থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ বা ৮৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি একটি স্বল্পমেয়াদী প্রবণতা নয়, বরং একটি টেকসই ধারার অংশ।
ব্যাংকারদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহে এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের পরিবর্তে এখন তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সরল হওয়ায় তারা উৎসাহিত হচ্ছেন। বিভিন্ন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং দ্রুত পরিষেবা নিশ্চিত করছে, যা এই ইতিবাচক ধারায় প্রভাব ফেলছে।
অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও শক্তিশালী করবে, যা আমদানি ব্যয় মেটাতে এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। এছাড়াও, রেমিট্যান্স দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের জন্য আরও নতুন নতুন এবং আকর্ষণীয় সেবা চালু করার পরিকল্পনা করছে, যা বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণকে আরও সহজ ও লাভজনক করবে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সমর্থন এবং প্রবাসীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।