ডারবানের কিংসমিড স্টেডিয়ামে এক অসাধারণ ক্রিকেটীয় দ্বৈরথের পর দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২১৪ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে জয়ের মুকুট ছিনিয়ে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এই রোমাঞ্চকর টেস্ট ম্যাচে স্বাগতিকদের বিরুদ্ধে অজিদের এই দাপুটে জয় বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ম্যাট রেনশর ব্যাটের জাদু এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার জন্য, যিনি তার বর্ণাঢ্য টেস্ট অধিনায়কত্বের ইতিহাসে প্রথম হারের স্বাদ পেলেন। ম্যাচের শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়া তাদের শক্তি প্রদর্শন করলেও, রেনশর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই ছিল জয়ের মূল ভিত্তি, যা দক্ষিণ আফ্রিকাকে শেষ পর্যন্ত কোণঠাসা করে ফেলে।
ম্যাটের রেনশর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে, এই ম্যাচকে 'রেনশ শো' বললেও অত্যুক্তি হয় না। অস্ট্রেলিয়ান দলের অন্য কোনো ব্যাটসম্যান দুই ইনিংস মিলিয়েও ফিফটির দেখা না পেলেও, রেনশ একাই প্রথম ইনিংসে ১৯০ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেন, যা দলের বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেয়। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় ইনিংসেও তার ব্যাট থেকে আসে গুরুত্বপূর্ণ ৮২ রান, যা দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে ৪২১ রানের এক বিশাল লক্ষ্য দাঁড় করাতে সাহায্য করে। তার এই ধারাবাহিক ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়ার জয়ের পথকে অনেকটাই সুগম করে তোলে এবং প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাখে।
ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া ৩৯০ রানের একটি শক্তিশালী স্কোর গড়ে তোলে, যেখানে রেনশর ১৯০ রান ছিল প্রধান আকর্ষণ। জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের প্রথম ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায়, ফলে অস্ট্রেলিয়া ১১২ রানের মূল্যবান লিড পায়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেটে ৩১৪ রান তোলার পর ইনিংস ঘোষণা করে, যা দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে ৪২১ রানের এক প্রায় অসম্ভব জয়ের লক্ষ্য ছুঁড়ে দেয়। এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকাকে শেষ দিনে এক বিশ্বরেকর্ড গড়তে হতো, যা তাদের জন্য ছিল এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
চতুর্থ দিনের শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ৪ উইকেটে ১০২ রান নিয়ে পঞ্চম দিনের খেলা শুরু করে, জয়ের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল আরও ৩১৯ রান। এই অবস্থায় ড্র করাও তাদের জন্য ছিল এক অবিশ্বাস্য অর্জন। দক্ষিণ আফ্রিকার ওপেনার এইডেন মার্করাম একাই দলের সম্মান রক্ষার কঠিন লড়াই চালিয়ে যান। তার দৃঢ়চেতা ব্যাটিংয়ে কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও, অন্য ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ায় দলটি ক্রমশ চাপে পড়তে থাকে। মার্করামের একার লড়াই ডারবানের উত্তপ্ত উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে পরিণত হয়।
পঞ্চম দিনের প্রথম সেশনটা উইয়েন মুল্ডারের সঙ্গে জুটি বেঁধে মার্করাম বেশ ভালোভাবেই পার করে দিচ্ছিলেন। দুজনে মিলে ৬৯ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন এবং দলকে কিছুটা স্থিতিশীলতা এনে দেন। কিন্তু প্রথম সেশনের শেষ ২০ মিনিটে জশ হ্যাজলউডের বলে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়ে মুল্ডার (১১০ বলে খেলা) আউট হয়ে গেলে এই জুটি ভেঙে যায়। মুল্ডারের বিদায়ের পরপরই কাইল ভেরানেও দ্রুত প্যাভিলিয়নে ফেরেন, যা দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শেষ করে দেয়।
মুল্ডার ও ভেরানের বিদায়ের পর মার্করামকে সঙ্গ দিতে আসেন মার্কো ইয়ানসেন। দুজনে মিলে কিছু সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু ইয়ানসেনও ৩৫ রান করে মুল্ডারের বলে বোল্ড হয়ে গেলে দক্ষিণ আফ্রিকার পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় সেশনের মাঝামাঝি সময়ে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে মিচেল স্টার্কের বলে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়ে মার্করামের একার লড়াইয়েরও অবসান ঘটে। তার আউটের সাথে সাথেই দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ের শেষ আশাটুকুও নিভে যায়। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে অসাধারণ বোলিং করে জশ হ্যাজলউড ৬টি মূল্যবান উইকেট শিকার করেন, যা তাদের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবশেষে, দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৬ রানে অলআউট হয়ে যায় এবং অস্ট্রেলিয়া ২১৪ রানের এক বিশাল জয় তুলে নেয়। এই হার দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। এর আগে তিনি তার অধিনায়কত্বে খেলা ১২টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে ১১টিতে জয় পেয়েছিলেন এবং একটি ড্র করেছিলেন, যা তার অধিনায়কত্বের একটি অসাধারণ রেকর্ড ছিল। ডারবানের এই পরাজয় তার সেই অপরাজিত থাকার রেকর্ডে ইতি টানল। ম্যাট রেনশর দুই ইনিংসের পারফরম্যান্স এবং জশ হ্যাজলউডের বিধ্বংসী বোলিং অস্ট্রেলিয়ার এই জয়ে অবিস্মরণীয় অবদান রাখে।