ব্রিসবেনের কঠিন উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে এক অসাধারণ কীর্তি গড়লেন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটার সোবহানা মোস্তারি। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তিনি শুধু নিজের নামই লেখালেন না, বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন। তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তাঁর ব্যাট থেকে আসা ১১৮ রানের মহিমান্বিত ইনিংসটি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলবে। এই সেঞ্চুরি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রতাপশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের নারী দলের সক্ষমতা প্রমাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অ্যানাবেল সাদারল্যান্ডের বল কোনোমতে ঠেকিয়ে ক্রিজের দিকে দৌড় শুরু করার সেই মুহূর্তটি ছিল এক ঐতিহাসিক ক্ষণ। নন-স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা অধিনায়ক নিগার সুলতানার সাথে সোবহানার দৌড়, পপিং ক্রিজ ছুঁয়েও আরও অনেকটা এগিয়ে যাওয়া — প্রতিটি পদক্ষেপেই যেন ছিল এক অদম্য জয়ের স্পৃহা। ব্যাট উঁচিয়ে ধরা, সতীর্থ নিগারকে জড়িয়ে ধরে বাঁধভাঙা উদ্যাপন, আর ড্রেসিংরুমে বসে সতীর্থদের স্পষ্ট উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে দিচ্ছিল এই অর্জন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের ক্রিকেটে রীতিমতো প্রতাপশালী দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, তাদেরই মাটিতে এমন পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
এই সেঞ্চুরিটির পরিসংখ্যানগত গুরুত্বও অপরিসীম। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরি করার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন সোবহানা। এর আগে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটার, পুরুষ বা নারী মিলিয়ে, মাত্র একবারই সেঞ্চুরি করেছিলেন – গত আগস্টে ডারউইন টেস্টে ছেলেদের দলের তানজিদ হাসান। সোবহানার এই ইনিংসটি তাই শুধু নারী ক্রিকেটে নয়, সামগ্রিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় লড়াইয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রতিকূল পরিবেশ ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে।
অস্ট্রেলিয়ার পেস এবং বাউন্সি উইকেটে রান তোলা বরাবরই চ্যালেঞ্জিং, বিশেষ করে বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠে বা বাইরে মিলিয়ে বাংলাদেশ যে ছয়টি ওয়ানডে খেলেছিল, তার কোনোটিতেই তারা ২০০ রানের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। এই সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতেও বাংলাদেশ মাত্র ১৫৩ রানে অলআউট হয়েছিল। আজকের ম্যাচেও বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুটা ছিল অত্যন্ত বাজে। ইনিংসের ৭.২ ওভারে মাত্র ৮ রানেই ৩টি মূল্যবান উইকেট হারিয়ে দল যখন ঘোর সংকটে, তখনই ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন সোবহানা মোস্তারি।
সেই কঠিন সময়ে দলের হাল ধরেন সোবহানা মোস্তারি এবং অধিনায়ক নিগার সুলতানা। তাদের দৃঢ় সংকল্প এবং ঠান্ডা মাথার ব্যাটিংয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে বাংলাদেশ। ৬৬ বলে নিজের হাফ সেঞ্চুরি পূরণ করেন সোবহানা, আর অপর প্রান্তে অধিনায়ক নিগার সুলতানা ১১৪ বলে ৭৪ রান করে অপরাজিত থেকে তাকে দারুণ সঙ্গ দেন। তাদের এই অনবদ্য জুটিতেই দল তিন অঙ্কের দেখা পায় এবং একটি সম্মানজনক স্কোরের দিকে এগিয়ে যায়। ২৪৩ বলের এই জুটিতে আসে ১৯৫ রান, যা অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এক অসাধারণ কীর্তি।
নিজের ইনিংসে সোবহানা ১২৪ বলে সেঞ্চুরি পূরণ করেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা অষ্টম ব্যাটার হিসেবে রেকর্ড বুকে নাম লেখান। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে তিনি তৃতীয় ব্যাটার হিসেবে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি পেলেন। এর আগে ফারজানা হক দুবার এবং নিগার সুলতানা একবার এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। সোবহানার ১৩৪ বলে খেলা ১১৮ রানের ইনিংসে ছিল ১৮টি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি। ম্যাগান স্কটের বলে বোল্ড হয়ে আউট হওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে এক বিশাল অবদান রেখে যান, যা দলের ২২০ রানের সংগ্রহে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
সোবহানা মোস্তারির এই ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের জন্য এক নতুন প্রেরণা হয়ে এসেছে। এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের উত্থান এবং তাদের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই পারফরম্যান্স তরুণ ক্রিকেটারদের অনুপ্রাণিত করবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের নারী দলের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সাহায্য করবে। ব্রিসবেনের মাটি থেকে এই জয়ধ্বনি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং আগামী দিনে আরও বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখাবে।