গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রবিবার দিবাগত রাতে উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের বড়চালা গ্রামে সংঘটিত এই মর্মান্তিক ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নিহতের স্বামী উদ্ভব চন্দ্র দাসকে (২৮) আটক করেছে পুলিশ। নিহত নারীর নাম সীমা রানী দাস (২৫), যিনি উদ্ভব চন্দ্র দাসের স্ত্রী এবং নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে অভিযুক্ত স্বামীর নির্বিকার আচরণ সবাইকে হতবাক করেছে।
পুলিশ ও নিহতের স্বজনদের ভাষ্যমতে, রবিবার দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে উদ্ভব চন্দ্র দাস নিজেই জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে জানান যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছেন। খবর পেয়ে শ্রীপুর থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান, ঘরের বাতি নিভিয়ে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে উদ্ভব লাশের পাশে বসে আছেন। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় পুলিশ তাকে দরজা খোলার জন্য বারবার অনুরোধ করে। একপর্যায়ে দরজা খুললে পুলিশ দেখতে পায়, উদ্ভব চন্দ্র দাস তাঁর স্ত্রীর রক্তাক্ত মরদেহের পাশেই বসে নির্বিকারভাবে ধূমপান করছেন। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে পড়েন। পরে পুলিশ তাকে তাৎক্ষণিক আটক করে এবং ঘর থেকে সীমা রানীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে।
আজ সোমবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে উদ্ভবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার একটি ঘরে তালা ঝুলছে এবং অন্য ঘরের দরজা শিকল দিয়ে আটকানো। বাড়ির উঠানে বসে ছিলেন উদ্ভবের বোনের স্বামী সুবল চন্দ্র দাস। তিনি জানান, ঘটনার সময় উদ্ভবের বাবা বাড়ির অন্য ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন এবং তিনি কিছুই বুঝতে পারেননি। পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে এসে উদ্ভবকে হেফাজতে নেয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে। সুবল চন্দ্র দাস আরও জানান, উদ্ভব দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের প্রতি আসক্ত ছিলেন। তার মাদকাসক্তি এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তাকে সম্প্রতি একটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। তিন মাস আগে তিনি সেখান থেকে বাড়ি ফেরেন। এর আগেও তাকে একাধিকবার পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্ভব চন্দ্র দাসের এটি দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। মাদকাসক্তির কারণে তাঁর প্রথম স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর প্রায় দুই বছর আগে তিনি সীমা রানী দাসকে বিয়ে করেন। প্রতিবেশীরা জানান, উদ্ভব প্রায়ই মাদক সেবন করতেন এবং তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যেত। এই ঘটনায় এলাকাবাসী স্তম্ভিত এবং নিহত অন্তঃসত্ত্বা সীমার জন্য গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণতিতেই এমন একটি জঘন্য ঘটনা ঘটেছে।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম এই ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, নিহত সীমা রানীর শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ওসি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, এই মর্মান্তিক ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং তদন্ত চলছে। পুলিশ আটক উদ্ভব চন্দ্র দাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
এই ঘটনা সমাজের মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণতি এবং পারিবারিক সহিংসতার আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একজন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীর এমন নির্মম মৃত্যু এবং তার স্বামীর এমন নির্লিপ্ত আচরণ জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে। বিশেষ করে গর্ভের অনাগত শিশুর এমন করুণ পরিণতি সবাইকে ব্যথিত করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মাদকাসক্তি এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট মানসিক অস্থিরতাই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হতে পারে। আটক উদ্ভব চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং তার অতীত ও বর্তমানের মাদকাসক্তির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে, এবং সবাই দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছেন।