পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে কুষ্টিয়াসহ চার জেলার পুলিশ একযোগে বিশাল সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। শুক্রবার ভোর চারটা থেকে শুরু হওয়া এই সমন্বিত অভিযানে দুপুর সোয়া বারোটা পর্যন্ত অন্তত এগারো জন অপরাধীকে আটক করা হয়েছে। সন্ত্রাস, অবৈধ দখল, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ব্যাপক তৎপরতা স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই অভিযান পদ্মার চরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম নিজে এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন এবং নিশ্চিত করেছেন যে, তার নেতৃত্বে প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য এই সাঁড়াশি অভিযানে যুক্ত রয়েছেন। কেবল কুষ্টিয়া নয়, সীমান্তবর্তী রাজশাহী, নাটোর এবং পাবনা জেলার চরাঞ্চলেও একই সময়ে অনুরূপ অভিযান চলছে। এই চার জেলার পুলিশের মধ্যে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে অপরাধীদের গোপন আস্তানাগুলো চিহ্নিত করে তাদের আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে। এই ধরনের বিশাল আকারের সমন্বিত অভিযান চরাঞ্চলের অপরাধীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করছে যে, তাদের অপতৎপরতা আর বরদাস্ত করা হবে না।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এসব এলাকায় চরের নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ বালুমহাল দখল, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, কৃষিজমির ফসল লুটপাট এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়শই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটতো। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরীহ কৃষকদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলাই এই অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বর্তমান অভিযানে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের ধরতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর, চিলমারী, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়ন এবং ভেড়ামারা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিবিড় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সম্ভাব্য অপরাধীদের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে এবং তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে চরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি নজরদারি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি সন্দেহজনক এলাকায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি চালিয়ে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম দুপুর সোয়া বারোটার দিকে গণমাধ্যমকে জানান, অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট এগারো জন ব্যক্তিকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সাঁড়াশি অভিযান আরও কয়েক ঘণ্টা ধরে চলবে এবং আটককৃতদের সংখ্যা বাড়তে পারে। প্রাথমিকভাবে আটককৃতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে অপরাধী চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। এই সফল অভিযান চরাঞ্চলের অপরাধ দমনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশাবাদী।
উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরেও এই চরাঞ্চলে পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়েছিল, যার ফলস্বরূপ বেশ কয়েকজন অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছিল। তবে সেবারের অভিযানের পর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় এবং অপরাধীরা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করায় এবার আরও ব্যাপক ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে নেমেছে। এবারের অভিযানের লক্ষ্য কেবল তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার নয়, বরং চরাঞ্চলে অপরাধের মূল উৎপাটন করা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
এই সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চলে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, এই অঞ্চলকে অপরাধমুক্ত করে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা হবে। এই ধরনের ধারাবাহিক ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা নির্ভয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে পারবে এবং কৃষকরা নিরাপদে তাদের ফসল উৎপাদন করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই অভিযান চরাঞ্চলের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।