রাজধানীর রমনা কালীমন্দিরে প্রতিমার স্বর্ণালংকার চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার মধ্যরাতে রাজধানীর উত্তরখান এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই তিনজনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে একজন চোরাই সোনা ক্রেতাও রয়েছেন। এই গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শুধু রমনা কালীমন্দির নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হওয়া আরও কয়েকটি মন্দিরের স্বর্ণালংকার চুরির রহস্য উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ভক্ত ও মন্দির কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন লিপি কর্মকার (২৯), তার স্বামী অর্ণব রায় (২৯) এবং মো. সুমন (৩৫)। পুলিশ জানিয়েছে, এই দম্পতি সরাসরি চুরির সঙ্গে জড়িত এবং সুমন তাদের কাছ থেকে চোরাই সোনা কিনতেন। শাহবাগ থানা পুলিশ ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযানে তাদের আটক করা হয়। মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করার পর এই অভিযান চালানো হয়, যা তদন্তে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।
গত ৭ অক্টোবর রমনা কালীমন্দিরে প্রতিমার বহুমূল্যবান স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনা ঘটে, যা দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পর শাহবাগ থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা সন্দেহভাজনদের গতিবিধি এবং পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই গতকাল মধ্যরাতে উত্তরখানের ধোবাদিয়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে প্রথমে লিপি কর্মকার ও তার স্বামী অর্ণব রায়কে আটক করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ধোবাদিয়াতেই সুমনের সোনার দোকানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সুমন তার দোকান থেকে চুরিকৃত স্বর্ণালংকার ক্রয় করতেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। এই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে মন্দিরের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সুযোগ বুঝে চুরির ঘটনা ঘটাতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) খোকন মিয়া আজ রোববার গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা রমনা কালীমন্দিরসহ অন্যান্য মন্দিরে সোনা চুরির কথা স্বীকার করেছেন। তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য উদঘাটনের জন্য রিমান্ড আবেদন জানিয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করলে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্য এবং চোরাই সোনার গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি রমনা কালীমন্দির ছাড়াও ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের শ্রীশ্রী লোকনাথ মন্দির এবং নরসিংদীর একটি কালীমন্দিরেও স্বর্ণালংকার চুরি করেছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে একই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছিল, যা ওই সময়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। এই গ্রেপ্তারগুলো দীর্ঘদিনের কয়েকটি অমিমাংসিত চুরির ঘটনার সমাধান এনে দিতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মন্দিরে প্রতিমার স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভক্ত ও সাধারণ জনগণের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। এই গ্রেপ্তারের ফলে মন্দিরের নিরাপত্তা জোরদার এবং এ ধরনের অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুলিশ এই চক্রের অন্যান্য সদস্যদের ধরতে এবং চুরি হওয়া সকল স্বর্ণালংকার উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ রোধে মন্দির কর্তৃপক্ষকে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি এবং জনগণের সচেতনতাও অপরিহার্য। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে এনে আরও গভীর তদন্তের মাধ্যমে এই চক্রের বিস্তারিত তথ্য এবং তাদের অপরাধের পরিধি সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে।