সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় ইজারাবিহীন মরাচেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর—এই ৯ দিনের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ বালু লুটের ঘটনায় ৩৭ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এই ঘটনায় আরও ১০ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং অবৈধ বালু কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক গত বুধবার দোয়ারাবাজার থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, উল্লেখিত ৯ দিনে মরাচেলা নদী থেকে প্রায় ২৫ লাখ ঘনফুট বালু অবৈধ উপায়ে উত্তোলন করা হয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ বালুর বাজারমূল্য আনুমানিক পাঁচ কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছে, যা পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল। এজাহারে আরও বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে যে, দোয়ারাবাজার উপজেলার শ্রীপুর মৌজার সোনাপুর ও পূর্ব সোনাপুর এলাকায় মরাচেলা নদী এবং নদীর পাড় কেটে এই বালু উত্তোলন করা হয়েছে। অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি এর পাড় ভেঙে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এলাকার ভূপ্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৩ অক্টোবর মামলার বাদী নিজেই ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগের সত্যতা পান। দেখা যায়, বিশাল এলাকা জুড়ে নদীর পাড় কাটা হয়েছে এবং বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা প্রমাণ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছে। এই ধরনের কার্যকলাপ স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং কৃষি জমির জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
অভিযুক্ত ৩৭ জনের মধ্যে ৩৩ জন দোয়ারাবাজার উপজেলার বাসিন্দা। বাকিদের মধ্যে ছাতক উপজেলার ৩ জন এবং সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ১ জন রয়েছেন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত চক্রটি শুধু স্থানীয় নয়, বরং পার্শ্ববর্তী উপজেলা এবং জেলা থেকেও পরিচালিত হচ্ছে, যা এই অপরাধের গভীরতা এবং চক্রের বিস্তৃতি নির্দেশ করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর শেকড় উন্মোচনের চেষ্টা চলছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, এলাকাটি তুলনামূলকভাবে দুর্গম হলেও প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত আছে। তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে, মরাচেলা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে টাস্কফোর্সের নিয়মিত অভিযান চলবে এবং কাউকে বেআইনিভাবে বালু তুলতে দেওয়া হবে না। তার এই বক্তব্যে অবৈধ বালু কারবারিদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির প্রতিফলন দেখা যায়।
অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে না, বরং নদীর গভীরতা হ্রাস, নদীর পাড় ভাঙন, বন্যা পরিস্থিতি অবনতি এবং কৃষি জমিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই মামলাটি অবৈধ বালু কারবারিদের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ পরিবেশ সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং ভবিষ্যতে এমন অবৈধ কার্যকলাপ রোধে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছিলেন। তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হবে এবং মরাচেলা নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা পাবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা প্রকাশ করেছে। এই মামলার মাধ্যমে অবৈধ বালু কারবারে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।