ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর একনিষ্ঠ ভক্তের অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে ভারতের কেরালার ইয়াদিল ইকবালকে। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি সরাসরি গ্যালারিতে বসে উপভোগ করার জন্য এই তরুণ পাড়ি দিয়েছেন ১৫ হাজার কিলোমিটারের এক মহাকাব্যিক পথ, যা সময় নিয়েছে প্রায় ৪০ ঘণ্টা। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে মেসির একটি গোল এবং দুটি অ্যাসিস্টের সাক্ষী হতে ইয়াদিলের এই অসম সাহসী অভিযান বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে।
কেরালার কোদুনগালুর গ্রামের বাসিন্দা ইয়াদিল ইকবাল তার যাত্রা শুরু করেন বেঙ্গালুরু থেকে। সেখান থেকে বিমানে চেপে তিনি লন্ডন ও নিউইয়র্ক হয়ে শেষ পর্যন্ত বুয়েনস আইরেসের মাটি স্পর্শ করেন। মেসির বিদায়ী ম্যাচ দেখার জন্য অনলাইনে টিকিট পেতে ব্যর্থ হওয়ার পরই তিনি এমন এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন। ইন্টারনেটে একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে পরিচিত ইকবাল তার এই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত ভিডিও এবং ছবির মাধ্যমে ইনস্টাগ্রামে তার ১৭ লাখ অনুসারীর সঙ্গে ভাগ করে নেন, যা তাকে আরও বেশি পরিচিতি এনে দিয়েছে।
মেসির প্রতি ইকবালের অনুরাগ এতটাই গভীর যে, তিনি তার সন্তানের নাম রেখেছেন ‘লিয়ান মেসিল’। শুধু তাই নয়, ২০১১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের পর তিনি নিজ বাড়ির কাছে ৩২ মিটার লম্বা ও ২০ ফুট প্রস্থের একটি বিশাল ম্যুরাল তৈরি করিয়েছিলেন, যেখানে মেসির বিভিন্ন ট্রফি জয়ের মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। ইকবালের জীবনের অন্যতম সেরা দিন ছিল চলতি বছরের জুনে, যখন মেসি নিজেই ইনস্টাগ্রামে তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর পর এই ম্যুরালটি দেখতে পান। এটি মেসির প্রতি তার ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
বুয়েনস আইরেসে পৌঁছানোর পর ইকবালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ম্যাচের টিকিট সংগ্রহ করা। অনলাইনে টিকিট না পাওয়ায় তিনি জানতেন যে, তাকে স্থানীয়ভাবে চেষ্টা করতে হবে। সৌভাগ্যক্রমে, আর্জেন্টিনায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি রিসেল মার্কেট বা পুনর্বিক্রির বাজার থেকে একটি টিকিট সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তবে এই টিকিটের জন্য তাকে গুনতে হয়েছে এক হাজার ডলার, যা মূল দামের প্রায় তিন গুণ বেশি ছিল। ইয়াদিল সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি জানতেন যে এটি একটি বড় ঝুঁকি ছিল, তবে মেসির ম্যাচ দেখার জন্য এই মূল্য দিতে তিনি দ্বিধা করেননি।
মেসির শেষ ম্যাচটি দেখার জন্য মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে পঞ্চম সারিতে বসেছিলেন ইয়াদিল ইকবাল। তার আসনটি মেসি থেকে মাত্র ১০ মিটার দূরত্বে ছিল। এই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত ইকবাল বলেন, “এটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে। হয়তো ভবিষ্যতে কিংবদন্তিদের ম্যাচে আমরা মেসিকে আবারও দেখব, কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তো আর দেখা যাবে না।” তার চোখে, এই মানুষটি তার জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছে এবং তার হৃৎস্পন্দনে কেবল মেসিরই দখল।
ইকবালের মতো ভারতের কেরালা এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা অঞ্চলের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মেসি ও আর্জেন্টিনার ফুটবলের প্রতি উন্মাদ। কেরালায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইকবাল জানান, ২০২১ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল সমর্থকেরা তাকে অনেক কটাক্ষ করত, বলত মেসি অভিশপ্ত এবং সে কখনোই আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো ট্রফি জিতবে না। কিন্তু মেসির বিশ্বকাপ জয়ের পর সেইসব সমালোচনার অবসান হয়। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের উদাহরণ টেনে ইকবাল আল-জাজিরাকে বলেছেন, “সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম মেসি যেন বিশ্বকাপ জেতে। চার বছর আগে সে এটা অর্জন করেছে এবং আমি নিজের চোখেই দেখেছি। এখন কিছুই আর বড় চ্যালেঞ্জ মনে হয় না।”
তিনটি রেস্টুরেন্টের মালিক ইয়াদিল ইকবাল তার এই যাত্রাকে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে স্বীকার করেছেন। ভারতে টিকিটের খোঁজ করার সময় প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও তার মনে ছিল। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, সরাসরি সেখানে গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করাই ছিল সেরা উপায়। তার এই যাত্রা শুধু একটি ম্যাচের জন্য নয়, বরং তার জীবনের এক আইকনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অবিস্মরণীয় প্রদর্শনী। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ, আশা এবং স্বপ্নের প্রতীক, যা ভক্তদের যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে অনুপ্রাণিত করে।