ফুটবলের তীর্থভূমি ওয়েম্বলিতে এক নাটকীয় ও ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা ম্যাচে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে ৩-২ গোলে হেরেছে ইংল্যান্ড। উয়েফা নেশনস লিগের এই ম্যাচে ইংলিশ ডিফেন্ডারদের ধারাবাহিক ভুল এবং তারকা স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিস স্বাগতিকদের জন্য মহূর্তে স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নিয়ে স্পেন তাদের অপরাজিত থাকার রেকর্ড আরও দীর্ঘায়িত করল। ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উত্তেজনাপূর্ণ, যেখানে বারবার হাতবদল হয়েছে খেলার নিয়ন্ত্রণ, আর শেষ হাসি হেসেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
ম্যাচের শুরুতেই ২ মিনিটের মাথায় ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় মার্ক গেহির মারাত্মক ভুলে স্পেনকে এগিয়ে দেন তরুণ প্রতিভাবান লামিনে ইয়ামাল। গেহির অসতর্কতা কাজে লাগিয়ে ইয়ামাল বল কেড়ে নিয়ে ওয়েম্বলিতে নিজের প্রথম গোলটি করেন, যা তার জন্য ছিল এক স্মরণীয় মুহূর্ত। তবে এই গোলের পর স্পেন তাদের পাওয়া দুটি সহজ সুযোগ নষ্ট করে, যার মধ্যে ফেরান তোরেসের শট গোলরক্ষক জেমস ট্র্যাফোর্ড রুখে দেন এবং অন্যটি বারের বাইরে মেরে বসেন। এই ভুলগুলোই যেন ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দেয়, যখন তারা ৩৬ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে জোড়া গোল করে লিড নেয়। অ্যান্থনি গর্ডন জুড বেলিংহামের পাস থেকে সমতাসূচক গোল করেন এবং এরপরই নিকো ও’রাইলির চিপ থেকে হ্যারি কেইনের ডাইভিং হেডে বল জালে আশ্রয় নেয়, যা প্রথমে আত্মঘাতী মনে হলেও কেইনের নামেই লেখা হয়।
প্রথমার্ধের শেষভাগে ২-১ গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় ইংল্যান্ড, যেখানে তাদের সমর্থকরা ইউরো ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের প্রতিশোধ নেওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫ মিনিটে ঘটে যায় ম্যাচের সবচেয়ে বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা। স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি বক্সের মধ্যে বেলিংহামের পায়ে আঘাত করলে ভিএআর-এর সাহায্যে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত আসে। গত মৌসুম থেকে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হ্যারি কেইন স্পট কিক নিতে এসে বল ক্রসবারে মারেন। পরবর্তীতে ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, শট নেওয়ার সময় কেইনের বাঁ পা সামান্য পিছলে যায়, যার ফলে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। গত ৩৬ বছরে স্পেনের বিপক্ষে পেনাল্টিতে পোস্টে বল মারা প্রথম খেলোয়াড় কেইন, এর আগে ১৯৯০ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কিংবদন্তি এনজো শিফো এমনটা করেছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালেও কেইন একটি পেনাল্টি মিস করেছিলেন, যা ইংলিশ শিবিরে নতুন করে হতাশায় ডুবিয়ে দেয়।
কেইনের পেনাল্টি মিসের মাত্র পাঁচ মিনিট পরই স্পেন ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে আনে। ইংল্যান্ডের লেফট ব্যাক নিকো ও’রাইলির ভুল পাস থেকে বল পেয়ে অ্যালেক্স বায়েনা গোল করে স্প্যানিশদের স্বস্তি এনে দেন। এরপর ম্যাচের ৭৪তম মিনিটে দুই বদলি খেলোয়াড়ের চমৎকার বোঝাপড়ার ফলস্বরূপ স্পেন জয়সূচক গোলটি লাভ করে। বায়েনার পাস থেকে মিকেল ওইয়ারসাবাল এক দারুণ চিপে বল ইংল্যান্ড গোলকিপার জেমস ট্র্যাফোর্ডের মাথার ওপর দিয়ে জালে পাঠিয়ে দেন। এই গোলটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং স্পেন ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। ওইয়ারসাবাল দুই বছর আগের ইউরো ফাইনালে স্পেনের জয়সূচক গোলটিও করেছিলেন, যা এই ম্যাচে তার পারফরম্যান্সকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ফেরার পর এটি ছিল ইংল্যান্ডের প্রথম ম্যাচ, যেখানে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বাগে পেয়েও শেষ পর্যন্ত হারতে হলো। কেইনের পেনাল্টি মিসের পর ইংলিশ কোচকে যেখানে হতাশ দেখাচ্ছিল, সেখানে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের মুখে ছিল স্বস্তির হাসি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এটিই ছিল স্পেনের প্রথম ম্যাচ এবং পিছিয়ে পড়েও এমন জয় দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই জয় আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেনের টানা ৩৯ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রাকে অক্ষুণ্ন রেখেছে। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে স্পেনের সর্বশেষ হার ছিল ২০২৩ সালের মার্চ মাসে।
ওয়েম্বলির এই ম্যাচে ইংল্যান্ডের পরাজয়ের পেছনে তিনটি প্রধান ভুল দায়ি ছিল: মার্ক গেহির প্রথম দিকের মারাত্মক ভুল, নিকো ও’রাইলির ভুল পাস যার ফলে স্পেন সমতায় ফেরে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিস। এই ভুলগুলোই ইংলিশদের ইউরো ফাইনালের হারের প্রতিশোধ নেওয়ার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং তাদের নেশনস লিগ অভিযান শুরু হয় পরাজয় দিয়ে। একই গ্রুপে (লিগ এ, গ্রুপ ৩) অন্য ম্যাচে ক্রোয়েশিয়া প্রাগে স্বাগতিক চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়লাভ করে তাদের নেশনস লিগ যাত্রা শুভসূচনা করেছে, যেখানে চিরসবুজ লুকা মদরিচ তার দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।