রবিবার, 4 অক্টোবর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ: এক বছরের অর্জন, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) তাদের বর্ধিত এক বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছে। বিতর্কিত শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট চালু এবং সংগ্রহশালার ছবি পরিবর্তনসহ নানা সমালোচনার মুখে পড়েছে ডাকসু। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করলেও, প্রশাসন ও ছাত্র সংসদের সমন্বয়হীনতা সফল বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ: এক বছরের অর্জন, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) তাদের বর্ধিত এক বছরের মেয়াদ শেষ করেছে। নির্ধারিত সময়ের কয়েক মাস পর এই সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং কমিটি তাদের কাজের এখতিয়ার হারাবে। তবে, এই বর্ধিত এক বছরে ডাকসুর নেতারা বিভিন্ন সময়ে এখতিয়ারবহির্ভূত কাজের জন্য সমালোচিত হয়েছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডের এই পর্যালোচনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ছাত্র সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যেকার সম্পর্ক এবং দায়িত্বের সীমারেখা নিয়ে।

ডাকসুর বর্তমান কমিটি নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছু দিন আগে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি ওয়েবসাইট চালু করে ক্যাম্পাসের ভেতরে আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনার শিকার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ মান নিশ্চিতকরণ সেল (আইকিউএসি) প্রতিটি সেমিস্টার শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করেছে, যদিও এটি এখনো পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ডাকসু কর্তৃক এ ধরনের জরিপ ফরম উন্মুক্ত করাকে অনেকে প্রশাসনকে অগ্রাহ্য করার শামিল বলে মনে করছেন। এমনকি এই জরিপে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও ছিল অত্যন্ত সীমিত, ফলে ‘ডিইউ টিচার্স ইভালুয়েশন’ সাইট দেখে কোনো শিক্ষক সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষকেরা শুধু ক্লাসই নেন না, তাঁরা গবেষণাকাজেও গভীরভাবে জড়িত থাকেন; সুতরাং, জরিপ ফরমে গবেষণার মূল্যায়নও থাকা প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করে।

সম্প্রতি ডাকসু সংগ্রহশালায় ছবি বদলের বিষয়টিও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় ধরনের ভূমিকাই দেখা যায়, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক বিরোধ অনস্বীকার্য। এই সংবেদনশীল জায়গা থেকে সংগ্রহশালায় কাদের ছবি কীভাবে থাকবে, তা নির্ধারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা দায়িত্বশীল শিক্ষকদের সহায়তা নেওয়া যেত। ডাকসুর গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের চেতনা সমুন্নত রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সংগ্রহশালার এই ‘সংস্কার’ দেখে অনেকের মনে হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসকে হয়তো নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিস্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের একাংশ’ শিরোনামে কয়েকজন মনীষীর ছবি টাঙানো নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। আপত্তির মুখে দ্রুতই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। একসঙ্গে ছয়জন লেখকের যেসব ছবি টাঙানো হয়েছিল, সেগুলোর কোনোটিই তাঁদের আসল ছবি ছিল না। এই কাজ যিনি বা যাঁরা করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে এমন দায়িত্বহীন ভূমিকা আশা করা যায় না। যারা ছবি বাছাইয়ের কাজ করেছেন, তারা জসীমউদ্‌দীন, মুনীর চৌধুরীসহ তালিকার কোনো ব্যক্তির ছবিই চিনবেন না—এমনটা ভাবতেই অবাক লাগে। তাছাড়া, প্রশ্ন থেকে যায়, এভাবে ‘একাংশের’ তালিকা করা যায় কি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে কবি-সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে, তাঁদের সবাইকে একটি নির্দিষ্ট দেয়ালে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়।

ডাকসুর নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ নেতারা নিজেদের কার্যক্রম ও অর্জনের একটি খতিয়ান তুলে ধরেন। তাঁরা দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুরো এক বছর ধরে তাঁরা কাজ করেছেন এবং এ সময়ে ৪১টি খাতে এক হাজারের বেশি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা সমাধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। তবে একই সঙ্গে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতার এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগও উত্থাপন করেন, যা ছাত্র সংসদ ও প্রশাসনের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য ডাকসু নেতাদের এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। প্রশাসনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন মেনে কিংবা বিধি অনুযায়ী কাজ করার জন্য তাদের তরফ থেকে সব সময় ডাকসু নেতাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন আরও জানিয়েছে যে, ডাকসুর যেকোনো বৈধ ও গঠনমূলক উদ্যোগে তাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। ছাত্র সংসদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে বারবার, যাতে কোনো কাজে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ না ওঠে।

ডাকসুর বর্তমান ভিপি দাবি করেন, গত এক বছরে হলের আবাসনসংকটের সমাধান, রিডিং রুম আধুনিকায়ন এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহন সমস্যা নিরসনে তাঁরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়াও তাঁদের কাজের মধ্যে আছে স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ সেল, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন বলে দাবি করা হয়।

তবে, ডাকসুর দাবি করা এসব উদ্যোগের কোনোটিই এখনো যথেষ্ট মাত্রায় গ্রহণযোগ্য রূপ লাভ করেনি এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যেকোনো পদক্ষেপ বা কাজের জন্য ছাত্র সংসদ ও প্রশাসনকে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। উভয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও সহযোগিতার অভাব থাকলে আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব নয় কিংবা কোনো উদ্যোগকে টেকসই করা সম্ভব নয়। ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের একেকটি পদের বিপরীতে দায়িত্ব কী, তা খুবই সুনির্দিষ্টভাবে ডাকসুর গঠনতন্ত্রে লেখা আছে। সুতরাং, গঠনতন্ত্র মেনে এবং প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে কাজ করাই ভবিষ্যৎ ছাত্র রাজনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ