সারা দিনের ব্যস্ততা আর কর্মমুখরতার পর যখন রাতের নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তখন মানুষের মন ও শরীর উভয়ই এক গভীর ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন থাকে। কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, ভবিষ্যতের উদ্বেগ কিংবা ছোট ছোট অস্থিরতা—সব মিলিয়ে দিনের শেষে মনে এক অদৃশ্য ভার জমা হয়। এমন সময় যখন বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি চলে, তখন অনেকেই হয়তো কেবল শারীরিক বিশ্রামকেই প্রাধান্য দেন। তবে, ইসলামে ঘুমের মতো একটি দৈনন্দিন কাজের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে আত্মিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক পরিচ্ছন্নতার এক গভীর দর্শন। প্রশ্ন জাগতে পারে, ঘুমানোর আগে অজু করার প্রয়োজন কী, যখন এটি সাধারণত নামাজ বা কোরআন স্পর্শের আগে করা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর নিছক একটি ধর্মীয় রীতির চেয়েও অনেক বেশি কিছুকে নির্দেশ করে।
অজু কেবল শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধুয়ে নেওয়ার নাম নয়; এটি একই সাথে আত্মিক পবিত্রতা ও মানসিক শান্তির এক অসাধারণ মাধ্যম। যখন দিনের ক্লান্তি শরীরকে অবসন্ন করে তোলে এবং মন নানা চিন্তায় ভারাক্রান্ত থাকে, তখন অজুর শীতল পানি মুখে, হাতে ও শরীরে স্পর্শ করলে এক ধরনের স্বস্তি অনুভূত হয়। এটি যেন দিনের জমে থাকা সকল অস্থিরতা ও কলুষতার ওপর প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। অস্থির মন নিয়ে বিছানায় গেলে অনেক সময় ঘুম আসতে চায় না। চোখ বন্ধ করেও মন ছুটে বেড়ায় অতীতের ঘটনা, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা বা বিভিন্ন মানুষের কথায়। এমন এক অদৃশ্য কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে শান্ত একটি মন অপরিহার্য, আর অজু সেই মানসিক প্রশান্তি অর্জনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অজু করে বিছানায় গেলে অন্তত নিজের কাছে এই অনুভূতি থাকে যে, আমি এখন পবিত্র অবস্থায় শুতে যাচ্ছি এবং আল্লাহর স্মরণে আমার রাত শেষ করছি। এই অনুভূতিটুকুই হৃদয়ের অস্থিরতা কমিয়ে দেয় এবং মনকে এক গভীর প্রশান্তি এনে দেয়। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা যুক্তির ওপর নির্ভরশীল একটি বিষয় নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা। তিনি সাহাবি বারা ইবনে আজিবকে উপদেশ দিয়েছিলেন, যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করে নেবে। এরপর তিনি ঘুমানোর আরও কিছু আদব শিক্ষা দিয়েছেন। এই নির্দেশনাটি প্রমাণ করে যে, ঘুম, যা আমরা প্রতিদিন করি এবং যার জন্য আলাদা কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার কথা সাধারণত আমাদের মনে আসে না, সেই ঘুমের মধ্যেও রাসুল (সা.) আমাদের জন্য রেখে গেছেন সুন্নাহর এক অসাধারণ সৌন্দর্য ও পবিত্রতা।
এই আমলের সঙ্গে আরও গভীর একটি বিষয় জড়িত রয়েছে, যা প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হাদিসে এসেছে, অজু করে বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর পর যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে সে 'ফিতরাতের' ওপর মৃত্যুবরণ করবে। এখানে 'ফিতরাত' শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক করে তোলে। মুহাদ্দিসগণ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ফিতরাত দ্বারা মানুষের স্বাভাবিক তাওহিদি বিশ্বাস এবং ইসলামের সহজাত প্রবণতাকে বোঝানোর কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, অজু করে ঘুমানোর অর্থ হলো জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহর প্রতি সহজাত বিশ্বাস ও পবিত্রতা বজায় রাখার চেষ্টা করা।
মানুষের জীবন অত্যন্ত অনিশ্চিত। কে জানে, আজকের রাতই হয়তো জীবনের শেষ রাত হতে পারে? প্রতিদিন রাতে আমরা ঘুমাতে যাই, কিন্তু প্রতিটি সকাল যে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই জায়গাতেই ঘুমের আগে অজুর গুরুত্ব নতুন করে অনুভূত হয়। ঘুম এবং মৃত্যুর মধ্যে একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে; উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ নিজের চারপাশের জগৎ থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নিজের ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলে। তাই একজন মুমিনের উচিত এমন অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া, যে অবস্থায় তিনি আল্লাহর সামনে ফিরে গেলেও যেন প্রস্তুত থাকেন এবং তাঁর রবের কাছে যেতে কোনো দ্বিধা বা অপবিত্রতা অনুভব না করেন।
সারা দিনের সকল ব্যস্ততার পর রাতের শেষ কাজটি যদি হয় অজু করা, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়া, তাহলে দিনের সমাপ্তিটা কত সুন্দর ও অর্থবহ হতে পারে! এই ছোট্ট আমলটির মাধ্যমে আমরা শুধু শরীরকেই পরিচ্ছন্ন করি না, মনকেও প্রশান্ত করি এবং একই সাথে প্রিয় নবী (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহকে আমাদের জীবনে ধারণ করি। যদি সেই ঘুমই জীবনের শেষ ঘুম হয়ে যায়, তবে অন্তত একজন মুমিন তার রবের কাছে যাওয়ার আগে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন সুন্নাহর অনুসরণ করার। মাত্র কয়েক মিনিটের এই আমলটি আমাদের জীবনকে এক ভিন্ন মাত্রা ও আধ্যাত্মিক গভীরতা প্রদান করে, যা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই আমাদের জন্য কল্যাণকর।