বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের এবং এগুলোর সমাধান স্বল্প সময়ে সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আগামী ২, ৩, ৫ বা ১০ বছরে গৃহীত উদ্যোগগুলো কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপর নিয়মিত নজরদারি করা হবে। 'সরকার কতখানি এগোল? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত' শীর্ষক এক সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ঢাকার একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই সংলাপের আয়োজন করে। সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত এই সংলাপে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং শিক্ষা বাজেটের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বক্তব্য ছিল সংলাপে উপস্থিত সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে, যেখানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি অঙ্গীকার এবং বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট মোট ২৪টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোনোটিই এখনো পুরোপুরি কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। কিছু উদ্যোগ প্রস্তাবনাধীন অবস্থায় রয়েছে, কিছু সবেমাত্র শুরু হয়েছে, আবার কিছু নীতি ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই ধীরগতি প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নে একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন না হওয়ায় সিপিডি দ্রুত এই কর্মসূচি অনুমোদন, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ পিইডিপি-৫ এর গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, প্রকল্পের বর্তমান দীর্ঘদিনের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো বিভিন্ন বিষয় একটি একক প্রকল্পের অধীনে রাখায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই জটিলতা নিরসনে বর্তমান কাঠামোয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়নে নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় শিক্ষক সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া, আগামী বছর থেকে দেশের দুর্গম এলাকার সব বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। পুষ্টিকর খাবারের মান নির্ধারণের পরও সরবরাহকারী না পাওয়ায় কিছু এলাকায় দরপত্রপ্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে; দুই দফায় পর্যাপ্ত সরবরাহকারী না পাওয়ায় এখন তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি, আগামী বছর সীমিত পরিসরে রান্না করা খাবার বিতরণের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার উন্নয়নে তাদের মধ্যে একটি দৃঢ় ঐকমত্য দেখা গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আগামী দিনের একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাকেই প্রধান শক্তি ও ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ড. ভট্টাচার্য আরও বলেন, শিক্ষার সব স্তরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা শক্তিশালী না হলে পরবর্তী স্তরগুলোও দুর্বল হয়ে পড়বে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করতে পারছে না, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না এবং মেধাবী শিক্ষকেরাও শিক্ষকতায় আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা সমাধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও উল্লেখ করেন, মানসম্মত শিক্ষার বিষয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন, শ্রমজীবী মানুষের অগ্রগতি এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি হতে হবে এই মানসম্মত শিক্ষা। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হতে এবং বৈশ্বিক সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করতে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা ছাড়া দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অসম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে অভিভাবকদের বাড়তি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর খরচ না হয়। তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসন—এই চার পক্ষকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরিতে জন্মনিবন্ধনের জটিলতা দূর করা, শিক্ষা সংস্কার কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করানো এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি আলোকপাত করেন।
ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিদ্যালয় নির্মাণ ও বিভিন্ন প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে অন্য বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। সামগ্রিকভাবে, সংলাপে উপস্থিত বক্তারা একমত হন যে, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং এর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নীতি প্রণয়ন, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।