শনিবার, 19 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা

আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’: ক্ষমতা, পাপ ও অনুশোচনার গভীরে এক মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান

ময়মনসিংহ বন্ধুসভা সম্প্রতি আহমদ ছফার কালজয়ী উপন্যাস ‘মরণ বিলাস’ নিয়ে এক পাঠচক্রের আয়োজন করেছে। উপন্যাসটি মানবজীবনের স্বর্গ-নরকের চিরন্তন সহাবস্থান, ক্ষমতা, লোভ আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের আত্মবিশ্লেষণকে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভঙ্গিতে তুলে ধরে।

শেয়ার করুন:
আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’: ক্ষমতা, পাপ ও অনুশোচনার গভীরে এক মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান

বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক আহমদ ছফার কালজয়ী মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস ‘মরণ বিলাস’ নিয়ে সম্প্রতি এক গভীর পাঠচক্রের আয়োজন করেছে ময়মনসিংহ বন্ধুসভা। ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর ময়মনসিংহ কার্যালয়ে আয়োজিত এই আসরে উপস্থিত বন্ধুরা উপন্যাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। আশির দশকের ক্রান্তিলগ্নে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি আহমদ ছফার সূক্ষ্ম জীবনবোধ ও মানব দর্শনকে এক ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপন করে, যা পাঠককে জীবনের প্রকৃত অর্থ ও মানবিক জটিলতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

‘মরণ বিলাস’-এর মূল উপজীব্য হলো মানবজীবনে স্বর্গ আর নরকের চিরন্তন সহাবস্থান। উপন্যাসটি এমন এক প্রেক্ষাপট তৈরি করে যেখানে মানুষের জীবন ও মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে সমাজ ও ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতা গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে। ক্যানসারে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফজলে ইলাহী এবং তার সুযোগসন্ধানী সহযোগী পাতিনেতা মাওলা বক্সের কথোপকথনের মধ্য দিয়েই কাহিনির শুরু এবং সমাপ্তি ঘটে। এই দুই চরিত্রের মধ্যে দিয়ে ছফা মানুষের লোভ, লালসা, ঘৃণা এবং ক্ষমতার অন্ধ দৌড়কে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফজলে ইলাহী, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন শ্রোতা খুঁজে ফেরেন, যিনি তার কৃতকর্মের ফিরিস্তি বিনা বাধায় শুনে যাবেন। দুঃসহ অনুশোচনা ও মৃত্যুর পরবর্তী অজানা জীবনের অনিশ্চয়তায় দিশাহারা মন্ত্রী তার জীবনে ঘটে যাওয়া তিনটি ভয়াবহ ঘটনা বর্ণনা করেন মাওলা বক্সের কাছে। এই ঘটনাগুলো কাম, লালসা, ঘৃণা আর অবিবেচনার মোড়কে আবৃত, যা মানবজীবনের চিরন্তন কদর্যতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তার স্বীকারোক্তিগুলো সমাজের উঁচু পদে থাকা একজন মানুষের নৈতিক স্খলন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

নিজের সৎভাইকে হিংসার বশে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার ঘটনা ছিল ফজলে ইলাহীর প্রথম স্বীকারোক্তি। এরপর তিনি রেঙ্গুনপ্রবাসী তার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে গভীর প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন, যার ফলস্বরূপ সেই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে লোকলজ্জায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। তৃতীয় ঘটনাটি ছিল তার ছাত্রজীবনের। অসৎ সঙ্গ পেয়ে তিনি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন এবং ঘৃণার আগুনে তার স্কুলের হিন্দু হেডমাস্টারের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেন, যার ফলে সেই শিক্ষকের সমস্ত সহায়সম্বল দগ্ধ হয়। এভাবেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে নিজেকে একজন সাধু নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এই পৈশাচিক ঘটনাগুলো ঘটানোর পরও ফজলে ইলাহী নিজের প্রতি কোনো অনুশোচনা অনুভব করেন না। বরং তিনি তার অপকর্মের জন্য সামাজিক রীতিনীতি এবং পারিপার্শ্বিকতাকে দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি শুধু খারাপ কাজই করেননি, তার জীবনে একটি মহৎ কাজও করেছেন – সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় একজন কিশোরের জীবন বাঁচিয়েছেন। তার মতে, এই একটি মহৎ কাজ তাকে বারবার পাপবোধে গ্রাস হওয়া থেকে রক্ষা করছে, যা তার আত্মপ্রবঞ্চনার এক জঘন্য দৃষ্টান্ত।

শুরুতে মাওলা বক্স মন্ত্রীর প্রশংসা ও তোষামোদ করলেও, মন্ত্রীর অপকীর্তির বর্ণনা শুনে তার মধ্যে এক গভীর ভাবান্তর ঘটে। ঘৃণা ভরা স্বরে মাওলা বক্স মন্তব্য করেন যে, মানুষ মানুষের কথা শুনতে পারে, এমনকি ধৈর্য থাকলে পশুর কথাও শুনতে পারে। তবে মনুষ্য সন্তান যখন পশুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন তাকে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মন্ত্রীর অপকর্মের কথা শুনে মাওলা বক্স নিজের মধ্যে এক তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগেন এবং মন্ত্রীর মৃত্যুর পর তার নিজের জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। মন্ত্রীর শেষ নিঃশ্বাসের আগে যখন তিনি একটি আলোর গ্রাস করার কথা বলেন, ঠিক পরক্ষণেই তার দেহ নিথর হয়ে যায়, যা উপন্যাসের এক নাটকীয় সমাপ্তি।

নিঃসন্দেহে ‘মরণ বিলাস’ আহমদ ছফার শ্রেষ্ঠতম কীর্তিগুলোর একটি। ময়মনসিংহ বন্ধুসভার পাঠচক্রে এই উপন্যাসের গভীরে প্রবেশ করে বন্ধুরা এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, সামাজিক সমালোচনা এবং দার্শনিক তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। উপন্যাসটি পাঠককে জীবনের প্রকৃত মূল্য, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং বেঁচে থাকার প্রকৃত অর্থ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এটি কেবল একটি কাহিনি নয়, বরং মানব অস্তিত্বের এক জটিল আয়না, যা আমাদের নিজেদের ভেতরের অন্ধকার ও আলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ