শনিবার, 19 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
জাতীয় 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

বান্দরবানে ‘পোহ-চগ্রু’ প্রদর্শনীতে পাহাড়ের ১১ জাতিগোষ্ঠীর বর্ণিল সংস্কৃতি

বান্দরবানের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে বর্ণিল ‘পোহ-চগ্রু’ প্রদর্শনী। পাহাড়ের ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র, অলংকার, বাদ্যযন্ত্র ও লোকজ জ্ঞান নিয়ে এই আয়োজন দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে। তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে পাহাড়ি জীবনের বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি।

শেয়ার করুন:
বান্দরবানে ‘পোহ-চগ্রু’ প্রদর্শনীতে পাহাড়ের ১১ জাতিগোষ্ঠীর বর্ণিল সংস্কৃতি

বান্দরবানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণ সেজে উঠেছে পাহাড়ি জীবনের বর্ণিল ঐতিহ্যে। গত শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী ‘পোহ-চগ্রু’, যা পাহাড়ের ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও লোকজ জ্ঞানকে এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে। এই অনন্য আয়োজনে দর্শনার্থীরা সুযোগ পাচ্ছেন পাহাড়ি জনপদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ধারাকে কাছ থেকে দেখার এবং অনুভব করার, যা তাদের নিজস্ব পরিচয় ও ইতিহাসকে তুলে ধরছে আধুনিক বিশ্বের সামনে।

প্রদর্শনীর প্রতিটি স্টলে সুনিপুণভাবে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছদ, যা তাদের বুননশৈলী ও রঙের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক। ম্রো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, লুসাই, খুমি, খেয়াং, পাংখোয়া, তঞ্চঙ্গ্যা এবং রাখাইন—এই ১১টি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এখানে। বিশেষত, পুঁতির অলংকারগুলির সূক্ষ্ম কাজ, বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রীর ব্যবহারিক দিক, মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলো এবং বিভিন্ন ধরনের লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সম্ভার দর্শকদের মন কেড়ে নিচ্ছে, যা তাদের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।

এই প্রদর্শনী কেবল কিছু বস্তুর সমাহার নয়, এটি যেন পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকা গল্প, শত শত বছরের পরম্পরা এবং লোকায়ত জ্ঞানের এক জীবন্ত দলিল। প্রতিটি হস্তশিল্পের পেছনে রয়েছে পূর্বপুরুষদের শেখানো কৌশল, প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতা এবং জীবিকার তাগিদে গড়ে ওঠা উদ্ভাবনী শক্তি। উদাহরণস্বরূপ, বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রগুলো যেমন তাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য, তেমনি মাটির প্রদীপ তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসবের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক এবং পরিবেশ-বান্ধব জীবনযাপন, যা আধুনিক সমাজে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট এই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে পাহাড়ের বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এক মহৎ উদ্যোগ নিয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম, তখন ‘পোহ-চগ্রু’র মতো প্রদর্শনীগুলো সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি কেবল স্থানীয়দের জন্য নয়, বরং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ এবং পর্যটকদের কাছেও পাহাড়ি সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধি তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করে, যা সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

প্রদর্শনীর প্রতিটি প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। অনেকেই আগ্রহভরে বিভিন্ন সামগ্রীর উৎস, ব্যবহার এবং এর পেছনের গল্প জানতে চাইছেন। স্থানীয় কারিগর ও শিল্পীরাও সানন্দে তাদের ঐতিহ্য ও জ্ঞান ভাগ করে নিচ্ছেন। এই মিথস্ক্রিয়া কেবল সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানই নয়, বরং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া বাড়াতেও সাহায্য করছে। শিশুদের জন্য এটি বিশেষ শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা, কারণ তারা বাংলাদেশের এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের মনন গঠনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বান্দরবান বরাবরই তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বহু-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য সুপরিচিত। এই জেলা যেন বাংলাদেশের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে। ‘পোহ-চগ্রু’ প্রদর্শনী এই সাংস্কৃতিক ঐক্যেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে, ভিন্নতা সত্ত্বেও কীভাবে একটি সম্প্রদায় তার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে, যা জাতীয় সংহতির এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে কাজ করে।

আগামীকাল রোববার পর্যন্ত এই প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত আগ্রহীরা বান্দরবান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এসে এই বর্ণিল আয়োজনের অংশ হতে পারবেন। পাহাড়ের মানুষের জীবন, শিল্প এবং সংস্কৃতির এই অসাধারণ মেলবন্ধন নিঃসন্দেহে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা দেবে, যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ