বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে চলমান সংকট নিরসনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং আবাসিক গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) সূত্রে জানা গেছে, কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখ থেকে এই কূপের গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তায় এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সেভাবে বাড়েনি, যার ফলে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে এবং পিক আওয়ারগুলোতে শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গৃহস্থালিতে গ্যাসের অপ্রতুলতা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও এই পরিমাণ দেশের মোট চাহিদার তুলনায় খুব বেশি নয়, তবে এটি সংকট নিরসনে একটি কার্যকর পদক্ষেপ এবং অন্যান্য অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করবে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র। ষাটের দশকে আবিষ্কৃত এই গ্যাসক্ষেত্রটি দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করে আসছে। সময়ের সাথে সাথে পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় নতুন কূপ অনুসন্ধান ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ২৮ নম্বর কূপটি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এর সফল বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রমাণ করে যে, দেশের অভ্যন্তরে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে, যা সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উত্তোলন করা সম্ভব।
এই কূপটি খনন ও উৎপাদন উপযোগী করতে দীর্ঘ সময় ধরে কারিগরি ও প্রকৌশলগত কাজ চলেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এই কূপ খনন কাজে সরাসরি যুক্ত ছিল এবং বিজিএফসিএল এর উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং স্থানীয় প্রকৌশলীদের নিরলস প্রচেষ্টায় এই কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হয়েছে, যা দেশের নিজস্ব সক্ষমতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই ধরনের প্রকল্পগুলো দেশের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে দেশীয় সংস্থার ভূমিকা আরও জোরদার করছে।
দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা যায়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং লোডশেডিং কমাতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি, শিল্প কারখানায় গ্যাসের চাপ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন থাকবে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, সার এবং অন্যান্য গ্যাস-নির্ভর শিল্পগুলো এই নতুন সরবরাহ থেকে উপকৃত হবে। এতে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
তবে, দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র নতুন কূপ থেকে প্রাপ্ত গ্যাস দিয়েই সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এজন্য নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিকৃত এলএনজি-র উপর নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলোকে কাজে লাগানোর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনুসন্ধান ব্লক এবং অফশোর এলাকায় নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের উপর জোর দিয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের অংশ।
এই নতুন গ্যাস সরবরাহ দেশের জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি জাতীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি আনতে সহায়ক হবে। দেশের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে জ্বালানি চাহিদা মেটানোর এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ গ্যাস সংকটের মতো চ্যালেঞ্জগুলো আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। এটি কেবল একটি কূপ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু নয়, বরং দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হওয়ার একটি কারণ।