রাজশাহী মহানগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) এক সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি নগর ভবনের সিটি হল সভাকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় রাসিক প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গৃহীত তিন মাসব্যাপী কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী কেবল কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। একইসঙ্গে তিনি নিজেও প্রধানমন্ত্রীর একজন কর্মী হিসেবে কর্মমুখী পদক্ষেপের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এই সভা থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় নগরবাসীর সম্মিলিত সহযোগিতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হয়।
প্রশাসক রিটন তার বক্তব্যে আরও বলেন, রাজশাহী নগরীর নাগরিকদের ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সিটি কর্পোরেশন বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই প্রচেষ্টা কেবল সিটি কর্পোরেশনের একার নয়, বরং নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ একটি সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ, যেখানে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ—সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ এবং ডেঙ্গুমুক্ত রাজশাহী গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নগরবাসীর সার্বিক সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাসিকের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত জনসচেতনতা সৃষ্টি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, নগরজুড়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা এবং মশকনিধন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা। প্রশাসক রিটন বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা বা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমতে না দিলে এডিস মশার বংশবিস্তার অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। তিনি মনে করিয়ে দেন, মশার লার্ভা ধ্বংস করা ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর অন্যতম।
নাগরিকদের প্রতি প্রশাসক রিটন সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার করার জন্য বিনীত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই অভ্যাস গড়ে তোলা শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধেই নয়, বরং রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতেও সহায়ক হবে। রাজশাহী মহানগরীকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এই পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়ন কার্যক্রম। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দুই লাখ ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, এবং প্রশাসক আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি সংখ্যক গাছের চারা রোপণ করা সম্ভব হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেন। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. মোফাখখারুল ইসলাম জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সকলের ভূমিকার উপর জোর দেন এবং বাসাবাড়িতে সপ্তাহে একদিন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে দুইদিন বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদ জানান, রাজশাহীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি ডেঙ্গুকে এডিস মশা বাহিত একটি ভাইরাসজনিত জ্বর হিসেবে উল্লেখ করে দিনে বা রাতে যেকোনো সময় মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
সভায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির সার্বিক তথ্য উপস্থাপন করেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা এবং বিভাগীয় পরিচালক স্বাস্থ্য কার্যালয়ের কীটতত্ত্বীয় টেকনিশিয়ান মো. আব্দুল বারী। তারা ডেঙ্গুর বর্তমান অবস্থা, মশার প্রজনন হার এবং ঝুঁকির ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। রাসিকের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জু ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশনের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন, যেখানে বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কীটতত্ত্ববিদ, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন এবং সকল অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় স্থাপন করা। রাজশাহী মহানগরীকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখতে এবং এর নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করে যাবে বলে সভায় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।