চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্থানীয় সংসদ সদস্যের আধা-সরকারিপত্র (ডিও লেটার) উপেক্ষা করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার একাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠনে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ অগ্রাহ্য করে ভিন্ন ব্যক্তিকে সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য নিজেই। এই ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগকারী সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম, যিনি চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন, জানিয়েছেন যে তিনি বাঁশখালীর বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চবিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনয়নের জন্য পৃথক ডিও লেটার দিয়েছিলেন। তার সুপারিশকৃত ব্যক্তিরা কোনো রাজনৈতিক দলের পদে ছিলেন না এবং শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই তাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংসদ সদস্যের দাবি, এসব সুপারিশ সম্পূর্ণ দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই করা হয়েছিল, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনায় সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।
সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী, প্রথমে স্কুল থেকে একটি প্যানেল জেলা প্রশাসনের কাছে সুপারিশের জন্য পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিক্ষাবোর্ডে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য চিঠি পাঠান। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসনের সুপারিশকেও সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করেছেন। এই ধারাবাহিকতার লঙ্ঘন প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয় বলে অনেকে মনে করছেন।
বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক গত ২৫ জুন তিনজন সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগীর নাম প্রস্তাব করেছিলেন, যা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪-এর প্রবিধি ৭৪(২) অনুযায়ী করা হয়েছিল। এই তালিকায় ব্যাংকার বেলালুর রহমানের নাম এক নম্বরে ছিল, যার জন্য সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলামও ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান তালিকার দ্বিতীয় ব্যক্তি অ্যাডভোকেট জায়েদ বিন রশিদকে সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দিয়েছেন, যা সংসদ সদস্যের সুপারিশ এবং জেলা প্রশাসনের অগ্রাধিকার উভয়কেই উপেক্ষা করেছে।
এই ঘটনাকে 'দায়িত্বহীন' আখ্যা দিয়ে সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, কমিটি অনুমোদনের বিষয়ে শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার পূর্বে সাক্ষাৎ এবং আলোচনাও হয়েছিল, এমনকি তারা একসঙ্গে খাবারও খেয়েছিলেন। এরপরও তার সুপারিশ উপেক্ষিত হওয়ায় তিনি শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় যে, এই বিষয়টি কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং সংসদ সদস্য এটিকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবমাননা হিসেবে দেখছেন।
এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে খুদে বার্তা এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি শিক্ষাবোর্ডে তার দপ্তরে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি, যার ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। এই নীরবতা বিতর্কের আগুনে আরও ঘি ঢালছে এবং জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
সংসদ সদস্যের ডিও লেটার উপেক্ষা এবং জেলা প্রশাসনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করার এই অভিযোগ শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশের এই অবমাননা স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঘটনা ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির গঠন প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। বর্তমানে, শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অভিযোগের পর এই বিষয়টি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।