ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ফজলুল হক মুসলিম হলের ১০১ নম্বর কক্ষটি অবশেষে দখলমুক্ত হয়েছে, যা দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। গত শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, হল সংসদ এক বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে কক্ষটি পুনরুদ্ধার করে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যা ক্যাম্পাসে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যার সমাধানে এবং হলের পরিবেশ উন্নয়নে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
হল সূত্রে জানা যায়, ফজলুল হক মুসলিম হলের মূল ভবনের এই ১০১ নম্বর কক্ষটি অন্তত ১৯৮০ সাল বা তারও আগে থেকে অবৈধ দখলে ছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষার্থীদের আবাসিক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হলেও, দীর্ঘকাল ধরে এটি শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে ছিল। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, হলের কিছু কর্মচারী এই কক্ষটি তাদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে উদ্দেশ্যহীন করে রেখেছিল। এই দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
গত শুক্রবার, বাদ জুমা, হল সংসদের উদ্যোগে কক্ষটি আনুষ্ঠানিকভাবে দখলমুক্ত করার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই কার্যক্রমে হল সংসদের এজিএস মহসীন উদ্দিন শাফি এবং জিএস ইমামুল হাসান সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে হল সংসদের সদস্যরা কক্ষটি পরিদর্শনে যান এবং এটিকে পুনরায় শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুত করার ঘোষণা দেন। এই পদক্ষেপটি হলের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
হল সংসদের নেতারা জানিয়েছেন, এখন থেকে দখলমুক্ত হওয়া এই কক্ষটি হলের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হবে। হল সংসদের এজিএস মহসীন উদ্দিন শাফি জানান, ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের পর থেকেই হলের বিভিন্ন দখলকৃত কক্ষ পুনরুদ্ধার করা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় হল সংসদের সকল সদস্যের ঐকমত্যে ১০১ নম্বর কক্ষটি দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এটি কেবল একটি কক্ষ পুনরুদ্ধার নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এবং সুস্থ ক্যাম্পাস জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণ।
হল সংসদের ভিপি খন্দকার আবু নাইম এই প্রসঙ্গে বলেন, 'হলের আবাসিক কক্ষগুলো বৈধ শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার। আমরা হলের ছাত্রদের এই অধিকার আদায়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষায় আপসহীন থাকব।' তার এই বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে এবং হলের অন্যান্য দখলকৃত কক্ষ পুনরুদ্ধারের বিষয়েও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুষ্ঠু ও নিরাপদ আবাসিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
উল্লেখ্য, ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহ্যবাহী ফজলুল হক মুসলিম হলটি মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন এই হলের প্রথম প্রভোস্ট। হল সংসদ নিশ্চিত করেছে যে ১০১ নম্বর কক্ষটিও প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল, যা দীর্ঘ চার দশক পর তার মূল উদ্দেশ্য ফিরে পেল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কক্ষটি পুনরুদ্ধারের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই ঘটনাটি শুধু ফজলুল হক মুসলিম হলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি প্রতীকী বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দখলদারিত্বের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ আবাসিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আশা করা হচ্ছে, এই উদ্যোগ অন্যান্য হলগুলোকেও তাদের দখলকৃত স্থান পুনরুদ্ধারে উৎসাহিত করবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে, যা সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।