সোমবার, 14 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
প্রশাসন 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচনে যুগান্তকারী পরিবর্তন

দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচন পদ্ধতিতে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। নতুন খসড়া প্রবিধানমালা অনুযায়ী, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তারাও সভাপতি হতে পারবেন, যা শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।

শেয়ার করুন:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচনে যুগান্তকারী পরিবর্তন

দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতি নির্বাচন পদ্ধতিতে বড় ধরনের সংশোধন আনা হচ্ছে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। শিক্ষামন্ত্রণালয় একটি নতুন খসড়া প্রবিধানমালা তৈরি করেছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং যোগ্য নেতৃত্বের হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অর্পণ করা।

প্রস্তাবিত খসড়া প্রবিধানমালা অনুযায়ী, ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতি পদে কারা প্রার্থী হতে পারবেন, সে বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বে কেবল কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচনের বিধান থাকলেও, এখন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি এবং কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তারাও সভাপতি প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি বহাল রাখা হয়েছে, যা শিক্ষার মান বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এই উদ্যোগের ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞ ও শিক্ষিত ব্যক্তিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রস্তাবিত এই প্রবিধানমালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং উপস্থিত সদস্যরা নতুন নিয়মাবলীর বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা করেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই এই সংশোধনী কার্যকর হবে। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রবিধানমালাটিকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।

নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন ক্যাটাগরির সদস্য পদে প্রথমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে সভাপতির নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করতে হবে। এই সভায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার সভাপতিত্ব করবেন এবং উপস্থিত নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হবেন। এই পদ্ধতি কমিটির সদস্যদের মধ্যে থেকেই নেতৃত্ব নির্বাচনের একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে।

সভাপতি নির্বাচনের সভায় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের ন্যূনতম দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা নির্বাচনের বৈধতা ও প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র নিশ্চিত করবে। যদি একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পান, তবে লটারির মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়াটিকে নিরপেক্ষ রাখবে। এছাড়া, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে সভাপতির পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে নতুন সভাপতি নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কোনো স্থবিরতা না আসে।

সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধিত প্রবিধানমালায় এই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের প্রবিধানমালাতেও একই যোগ্যতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যোগ্য ও শিক্ষিত নেতৃত্ব নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কিছু বিধিনিষেধও প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক বা কর্মচারী ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না। এছাড়া, একই ব্যক্তি একই ধরনের দুটির বেশি এবং মেয়াদভিত্তিক ধরনের তিনটির বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না। এই বিধানগুলো একজনের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া রোধ করবে এবং আরও বেশি সংখ্যক যোগ্য ব্যক্তিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেবে।

গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রবিধানে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম প্রস্তাবের বিধান ছিল। ২০২৫ সালের সংশোধিত প্রবিধানে ক্ষেত্রমত বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনার বিধান আনা হয়, যেখানে সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম প্রস্তাবের সুযোগ রাখা হয়। তবে, ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত প্রবিধানে গভর্নিং বডির সভাপতি পদে সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নামের তালিকায় ক্রমধারা কোনোভাবেই অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে না।

প্রস্তাবিত খসড়া প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির নির্বাচিত সভাপতির কিছু ক্ষমতাও রহিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা। এই ক্ষমতা রহিত করার ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সভাপতির একক প্রভাব কমে আসবে এবং তা আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলি সামগ্রিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক করে তোলার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ