দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার ধারাবাহিকতায় সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবারও (১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) ব্যাপক দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। এই পতনের ফলে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয়ই নেতিবাচক ধারায় দিন শেষ করেছে। বিশেষ করে, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স গত সাড়ে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
দিনের শুরুতে অবশ্য বাজারের চিত্র ভিন্ন ছিল। সোমবার লেনদেন শুরু হয়েছিল বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছিল। লেনদেনের একপর্যায়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৬ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। তবে দুপুর ১২টার পর থেকে বাজারের গতিপথ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। দাম বৃদ্ধির তালিকা থেকে একের পর এক প্রতিষ্ঠান দাম কমার তালিকায় নাম লেখাতে শুরু করে এবং এই ধারা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
দিনের লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মাত্র ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতে ২৯৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মূল্য হ্রাস পায়, যা বাজারের সামগ্রিক দুর্বলতা স্পষ্ট করে তোলে। এছাড়া, ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম অপরিবর্তিত থাকে। এই পরিসংখ্যান বাজারের ব্যাপক দরপতনের চিত্রকেই তুলে ধরেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদান ক্ষমতার ভিত্তিতেও শেয়ারের দামে মিশ্র প্রভাব দেখা গেছে। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী ২৪টি ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও, ১৬৮টির দাম কমেছে এবং ৬টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ প্রদানকারী ৯টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে ৬৩টির দাম কমেছে এবং মাত্র ২টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে 'জেড' গ্রুপে স্থান পাওয়া ২৩টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও, ৬৮টির দাম কমেছে এবং ২৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে, একটির দাম বাড়লেও ৩৩টির দাম হ্রাস পেয়েছে।
এই ব্যাপক দরপতনের ফলস্বরূপ, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৩৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৩৭৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এটি চলতি বছরের ১ জুনের পর সর্বনিম্ন অবস্থান, যেখানে ওই তারিখে সূচকটি ছিল ৫ হাজার ৩৭২ পয়েন্টে। একইভাবে, বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৯ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৬২ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৮ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৭৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে, যা বাজারের সকল খাতেই নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বাজারটিতে এদিন মোট লেনদেন হয়েছে ৪৮৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৭১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সেই হিসাবে, একদিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৮৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লেনদেনে অনীহার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। এই কমে যাওয়া লেনদেন বাজারের তারল্য সংকটের দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
লেনদেনের দিক থেকে এনভয় টেক্সটাইল এদিন শীর্ষে ছিল, যার শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২৫ কোটি ২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় স্থানে ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, যার লেনদেন পরিমাণ ১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ১৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। এছাড়া, শীর্ষ ১০ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স, সায়হাম টেক্সটাইল, সায়হাম কটন, নিটল ইন্স্যুরেন্স, যমুনা ব্যাংক এবং রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে।
দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর চিত্রও ছিল হতাশাজনক। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৩৯টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৩৬টির দাম কমেছে এবং ৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এর ফলে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৬১ পয়েন্ট কমেছে। তবে, সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে, যা ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। এই ধারাবাহিক দরপতন ক্ষুদ্র ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বাজারের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে তারা মনে করছেন।