বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে চলমান দরপতনের ধারা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের দর কমে যাওয়ায় বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এই ধারাবাহিক পতনে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারানোর শঙ্কায় ভুগছেন, অন্যদিকে লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাজারের প্রাণচাঞ্চল্যও হ্রাস পাচ্ছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (৩০ আগস্ট, ২০২৬) প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসই এবং অন্য শেয়ারবাজার সিএসইতে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে, যার ফলে মূল্যসূচকও নিম্নমুখী হয়েছে। এদিন লেনদেনের শুরুতেই কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান দরপতনের তালিকায় চলে আসে এবং দিনের লেনদেন শেষে এই প্রবণতাই বজায় থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসইতে কয়েক দফা বড় ধরনের দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। গত ২৫ আগস্ট পতনের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে, যা প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। ওইদিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫০৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এরপর গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সূচক কিছুটা বাড়লেও লেনদেন আরও কমে ৪৬৭ কোটি ১ লাখ টাকায় দাঁড়ায়, যা গত ১৬ মার্চের পর সর্বনিম্ন লেনদেন। এর আগে টানা পাঁচ কার্যদিবস (১৮ আগস্ট পর্যন্ত) শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত ছিল, যেখানে ভালো-মন্দ নির্বিশেষে বিভিন্ন খাতের শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়।
বাজারসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই চলমান দরপতনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি, বাজারে বিক্রির চাপ বৃদ্ধি এবং তারল্যের সংকটই এর মূল কারণ। বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে বিনিয়োগ না করে 'অপেক্ষার নীতি' অনুসরণ করছেন, যার ফলে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার চাপ ক্রমশ বাড়ছে এবং দরপতনকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলিয়ে মাত্র ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। এর বিপরীতে ৩০৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে এবং ৩৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ২৬টি ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও ১৬৩টির দাম কমেছে এবং ১১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। একইভাবে, ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া মাঝারি মানের ১২টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও ৫৮টির দাম কমেছে এবং ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে 'জেড' গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১১টির শেয়ারের দাম বাড়লেও ৮৯টির দাম কমেছে এবং ১৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রেও একটির দাম বাড়ার বিপরীতে ২৯টির দাম কমেছে এবং ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এই পরিসংখ্যান বাজারের সামগ্রিক দুর্বলতার একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
মূল্যসূচকের দিকে তাকালে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬১৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১২ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১২২ পয়েন্টে নেমে গেছে। এছাড়া, ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে এক হাজার ১২৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। যদিও মূল্যসূচক কমেছে, তবে এদিন ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৫১৮ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের ৪৬৭ কোটি এক লাখ টাকার তুলনায় ৫১ কোটি ২ লাখ টাকা বেশি।
রোববার ডিএসইতে লেনদেনের ক্ষেত্রে সায়হাম টেক্সটাইল সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে। কোম্পানিটির ২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২১ কোটি ২৪ লাখ টাকার। এছাড়াও ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সায়হাম কটন। শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও রয়েছে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল এবং সামিট অ্যালায়েন্সের মতো কোম্পানিগুলো, যা বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও কিছু নির্দিষ্ট শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।