বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় ও মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সম্প্রতি বিএসইসি'র চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন যে, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা স্বনামধন্য ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সহজে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এই নতুন নীতিমালার লক্ষ্য হলো পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘ক্যাপিটাল মার্কেট: গ্রোথ ডায়ালগ-পাথওয়ে টু লিস্টিং' শীর্ষক এক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। চট্টগ্রাম চেম্বার এবং আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সংলাপে তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিভিন্ন সুবিধা ও প্রক্রিয়া সহজীকরণের দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলো করপোরেট ট্যাক্সে ছাড়, সহজে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি, কৌশলগত ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণসহ বহুবিধ আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ভোগ করে। এসব সুবিধা কোম্পানিগুলোকে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনুপ্রাণিত করবে।
বর্তমানে, যেসব বৃহৎ কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার বা সম্পদের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি, সেগুলোকে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই নীতি গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের প্রতিষ্ঠিত ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার মাধ্যমে বাজারকে আরও স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করে তোলা। সরাসরি তালিকাভুক্তির এই প্রক্রিয়া কোম্পানিগুলোর জন্য সময় ও খরচ সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা তাদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ায় তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সংস্কার আনা হচ্ছে। বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান যে, আইপিওতে তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিগুলোকে একবার অডিট সম্পন্ন করতে হবে, যা পরবর্তীতে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন হবে না। এটি কোম্পানিগুলোর ওপর থেকে অডিটের দীর্ঘসূত্রতার চাপ কমাবে এবং প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করবে। এছাড়াও, আইপিওতে নির্দিষ্ট ফিক্সড প্রাইসের পরিবর্তে ইন্ডিকেটিভ মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এই নমনীয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের সাথে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
মাসুদ খান তার বক্তব্যে আরও জোর দিয়ে বলেন যে, ব্যবসা শুরু, সম্প্রসারণ, পুনর্গঠন ও পরিচালনার জন্য উদ্যোক্তারা সাধারণত মানি মার্কেট বা পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে থাকেন। তবে, ব্যবসার স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়নের জন্য পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করাই বেশি শ্রেয়। কারণ, পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সরবরাহ করে, যা ব্যবসার ঝুঁকি কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, তালিকাভুক্তির দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী অর্থলগ্নি খাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যা পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা আনছে না এবং ব্যবসার টেকসই প্রসারকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, দেশের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের তুলনায় গড় ট্রেডিং বেশি। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে এবং বাজারকে আরও সুসংহত করতে বড় ও মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে স্টক মার্কেটে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। তিনি মনে করেন, মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বৃদ্ধি পেলে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং এটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ, যেমন – নিয়ন্ত্রক সংস্থা, চেম্বার অব কমার্স, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এবং কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
বিএসইসি'র এই নতুন নীতিমালার বাস্তবায়ন দেশের পুঁজিবাজারে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে, যা তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সাথে, বিনিয়োগকারীরাও আরও নির্ভরযোগ্য ও মানসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন, যা তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও মুনাফার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে। এই উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।