সোমবার, 14 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
মধ্যপ্রাচ্য 🇧🇩 বাংলা

ইয়েমেনে তীব্র সংঘাত: হুতি ও সরকারি বাহিনীর মুখোমুখি লড়াই, সৌদিতেও হামলা, হরমুজে উত্তেজনা

লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখার পতনের পর ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মারিবের দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রায় সংঘাত আরও বেড়েছে। একই সময়ে হুতিরা সৌদি আরবে হামলা জোরদার করেছে, এবং হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে।

শেয়ার করুন:
ইয়েমেনে তীব্র সংঘাত: হুতি ও সরকারি বাহিনীর মুখোমুখি লড়াই, সৌদিতেও হামলা, হরমুজে উত্তেজনা

লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার পতনের পর দেশটির সশস্ত্র হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ শহরের কাছে কাধা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি ও মুখোমুখি সংঘর্ষ চলছে। এই ঘটনা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধকে আরও এক ধাপ গুরুতর করে তুলেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মারিব শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে সেখানেও তারা সরকারি বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। এই শহরটি ইয়েমেনের বৃহত্তম তেল ও গ্যাস কেন্দ্রগুলির অন্যতম এবং এখানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাও রয়েছে। মারিবের নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, দেশটির রাজস্ব প্রবাহ এবং উত্তরাঞ্চলে তাদের সামরিক অবস্থানও সেই পক্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাই এই শহরের দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বর্তমানে এক মরণপণ লড়াই চলছে।

ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সংঘাত বৃদ্ধির পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবেও তাদের হামলা জোরদার করেছে। সম্প্রতি তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হুতিরা জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি বাহিনী ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে তাইজ এবং মারিবের কাছের হুতি অবস্থানগুলোও লক্ষ্যবস্তু ছিল।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি জাহাজে হামলার ঘটনা। ইরান দাবি করেছে যে, হরমুজের অদূরে কাসেম দ্বীপের কাছে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছে বলেও ইরান জানিয়েছে। এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীসহ মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী সোমবার ওমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছে ইরান। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাহরাইন অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, আয়ারল্যান্ডে নিজের গলফ রিসোর্টে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, হরমুজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠকে তার কিছু যায় আসে না, এটি তাদের নিজস্ব বিষয়।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে আল-জাজিরার একজন প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার মোখা শহরের পতনের পর কাধা এলাকায় হুতি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে এটিই প্রথম সরাসরি সংঘর্ষ। উভয় পক্ষই এই এলাকায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করছে এবং সরকারি বাহিনী সেখানে বিমান হামলাও চালাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের মারিবের পশ্চিমে আল-মাশজাহ ও আল-জোর এলাকায় হুতিদের একটি বড় ধরনের হামলা সরকারি বাহিনী ঠেকিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাস ক্যাম্পের কাছেও ব্যাপক গোলাগুলির পাশাপাশি হুতিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।

ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, যখন হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি জোট ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলেও, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা নতুন করে তীব্রতর হওয়ায় গৃহযুদ্ধ আবার পূর্ণ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, গত জুলাই মাস থেকে ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, চলতি সপ্তাহে দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে, যা মানবিক সংকটের গভীরতাকে তুলে ধরে।

মোখা এবং পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সরকারি বাহিনী বিমান হামলা চালাচ্ছে। সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি বলেছেন, মোখা-ধুবাব সড়কে হুতিদের যানবাহন ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একইসাথে তাইজ অঞ্চলেও হুতিদের অবস্থান ও ব্যারাকে তিনটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য ও মারিবের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা জানিয়েছেন, সরকারি বাহিনীর একটি অংশ লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল থেকে সরে গিয়ে মারিবে পুনর্গঠিত হচ্ছে। তিনি মোখা ও পশ্চিম উপকূলে সরকারি বাহিনীর পরাজয়কে 'দুঃখজনক' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইয়েমেনের সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স জানিয়েছে, গত ৯ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম উপকূলে হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের পাঁচ শতাধিক সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। এই হতাহতের সংখ্যা চলমান সংঘাতের ভয়াবহতা নির্দেশ করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠছে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ