মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হচ্ছে, যেখানে সৌদি আরব একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি ভূখণ্ডে যেমন হামলা চালাচ্ছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। একই সময়ে ইরাক থেকেও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। এই ধারাবাহিক হামলাগুলো রিয়াদ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুথিরা সৌদি আরবের জাজান প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন জাজানের আল-তুয়াল এলাকায় আঘাত হানে, যার ফলে একটি মসজিদসহ একাধিক বাড়িঘর ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাজান ইয়েমেন সীমান্তবর্তী একটি প্রদেশ হওয়ায় সেখানে হামলার ঘটনা নতুন নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ হুথিদের এই হামলাকে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এর আগে, গত ৮ সেপ্টেম্বর হুথিরা সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতেও হামলার দাবি করেছিল। ওই দিন আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরানকে লক্ষ্য করে চালানো বড় ধরনের হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছিলেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়।
ইয়েমেন ছাড়াও, ইরাক থেকেও সৌদি আরবের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এই হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী ইরাকের মাইসান প্রদেশ থেকে চালানো হয়েছিল বলে ইরাক সরকার স্বীকার করেছে। ঘটনার পর বাগদাদ ওই প্রদেশের একজন সামরিক কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে, যা এই হামলার গুরুত্ব এবং ইরাকের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়।
প্রায় ১২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানির প্রধান পথ এটি। এই পাইপলাইনটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন করে। ফলে এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইরাক থেকে হামলার পরও সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর রিয়াদ আপাতত সংযত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা বন্ধে বাগদাদ যে উদ্যোগ নেবে, সৌদি আরব তাকে সমর্থন করবে। তবে একই সঙ্গে রিয়াদ তাদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। এই বিবৃতি সৌদি আরবের সতর্কতা এবং আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর জোর দেয়, যা ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক হুমকির মুখে তাদের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরে।
সৌদি আরবের ওপর এই ধারাবাহিক হামলাগুলো এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। এরপর চলতি বছরের আগস্টে তুরস্কও এতে যুক্ত হলে এই জোট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তিন দেশ রিয়াদে একটি যৌথ সচিবালয়ও গঠন করেছে, যা এই চুক্তির বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো তিন সদস্য দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। তবে, চুক্তির আওতায় কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেবে, তার বিস্তারিত কাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি। এই অস্পষ্টতা বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অবশ্য সম্প্রতি বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে হামলা হলে পাকিস্তান পাশে থাকবে। তার এই মন্তব্য চুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগের একটি ইঙ্গিত বহন করে, যা আঞ্চলিক মিত্রতার গুরুত্ব তুলে ধরে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের এই নতুন ধাপে সৌদি আরবের ওপর একের পর এক হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জ করছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে, নাকি এটি কেবল একটি প্রতীকী জোট হিসেবেই থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে। এই চুক্তির ভবিষ্যৎ প্রয়োগ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করতে পারে, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।