সোমবার, 14 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
মধ্যপ্রাচ্য 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা: বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক সামরিক শক্তির উত্থান

আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। একসময় গেরিলা বাহিনী হিসেবে পরিচিত হলেও, ইরান ও নিজস্ব প্রযুক্তির সহায়তায় তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে এক গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং নৌ সক্ষমতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন:
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা: বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক সামরিক শক্তির উত্থান

আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তাদের এই সামরিক অগ্রগতি শুধু সৌদি আরব নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে— হুথিরা আসলে কারা, এবং তাদের সামরিক শক্তি ঠিক কতটা? কেনই বা তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এত বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে?

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা একসময় মূলত স্থানীয় গেরিলা বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ, ইরানের কাছ থেকে প্রাপ্ত কৌশলগত সহায়তা এবং নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার কারণে তারা এখন এমন এক সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং নৌ-অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় তাদের দ্রুত অগ্রগতি এবং কৌশলগত মোখা বন্দর ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনা তাদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে।

বর্তমানে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা-সহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সামনের সারিতে সংঘাত তুলনামূলকভাবে স্থবির থাকলেও, ২০২৬ সালে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক যুদ্ধ নতুন করে ইয়েমেনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। লোহিত সাগরের দিকে হুথিদের এই অগ্রগতি তাদের শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসেবেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম একটি আঞ্চলিক সামরিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরেছে।

হুথিদের সামরিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাদের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডার। তাদের হাতে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণেও হুথিদের ব্যবহৃত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে ইয়েমেন সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা হুথিদের ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে দূরের লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে হামলা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে। অতীতে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, এমনকি রিয়াদের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যেও হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছিল এই গোষ্ঠীটি।

তবে হুথিদের হাতে ঠিক কতটি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে নেই। বিভিন্ন মডেল ও উৎসের অস্ত্র তাদের ভাণ্ডারে থাকায় সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— তারা এসব অস্ত্র নিয়মিতভাবে ব্যবহার এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সংযোজন বা উৎপাদন করার সক্ষমতা তৈরি করেছে। এই সক্ষমতা তাদের সামরিক শক্তিকে আরও স্থিতিশীল ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে, কারণ একটি নির্দিষ্ট সরবরাহ চেইন বা কারখানার উপর তাদের নির্ভরশীলতা কম।

হুথিদের সামরিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের ড্রোন সক্ষমতা। একসময় অপেক্ষাকৃত সীমিত সক্ষমতার এই অস্ত্র এখন তাদের যুদ্ধকৌশলের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাদের হাতে স্বল্পপাল্লার ড্রোন থেকে শুরু করে দীর্ঘপাল্লার একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন বা ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ইউএভি' রয়েছে, যা দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। কাসেফ ও সাম্মাদ পরিবারের ড্রোনসহ ইরানি নকশার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যবস্থা হুথিরা সফলভাবে ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে তুলনামূলক সহজ প্রযুক্তির ড্রোন তৈরি বা সংযোজনের সক্ষমতাও তারা গড়ে তুলেছে, যা তাদের সামরিক স্বনির্ভরতার ইঙ্গিত বহন করে।

এখানেই হুথিদের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিহিত। অত্যাধুনিক একটি অস্ত্র পুরোপুরি তৈরি করার সক্ষমতা না থাকলেও, তারা বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ও নকশা ব্যবহার করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্র তৈরি বা সংযোজন করতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট কারখানা বা সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা চালিয়ে তাদের পুরো ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। এই স্থানীয় উৎপাদন ও অভিযোজন ক্ষমতা তাদের সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে।

হুথিদের সামরিক শক্তিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তাদের নৌ-আক্রমণ সক্ষমতা। বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মতো কৌশলগত জলপথে তাদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারা অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র, সমুদ্র মাইন এবং ছোট দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। লোহিত সাগরে তাদের এই কার্যক্রম কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে, যা তাদের হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার অন্যতম প্রধান কারণ। সামগ্রিকভাবে, হুথি বিদ্রোহীরা এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি অপরিহার্য ও প্রভাবশালী সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ