রবিবার, 13 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
মধ্যপ্রাচ্য 🇧🇩 বাংলা

ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি ভেঙে তীব্র উত্তেজনা: সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের ১২৯ হামলার অভিযোগ

ইয়েমেনে পুনরায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, গত ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি আরবের বিমান বাহিনী সাতটি প্রদেশে অন্তত ১২৯টি হামলা চালিয়েছে, যা চলমান উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এই ঘটনা শান্তি প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) অভিযোগ করেছে যে, গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সৌদি আরবের বিমান অন্তত ১২৯ বার ইয়েমেনের সাতটি প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। এই অভিযোগ এমন এক সময়ে এলো যখন ইয়েমেনের শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হচ্ছিল। হুতিদের এই দাবি, যা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও, চলমান সংঘাতের তীব্রতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এই বিমান হামলাগুলো ইয়েমেনের মারিব, আল-জাওফ, সাদা, হাজ্জাহ, তায়েজ, আল-বায়দা এবং ধালে প্রদেশগুলোতে চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, এসব হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হুতিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এই আগ্রাসন যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর মাধ্যমে শান্তি আলোচনার পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই অভিযোগগুলো ইয়েমেনের মানুষের জন্য নতুন করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরার স্বপ্ন আবারও ফিকে হয়ে আসছে।

ইয়েমেনের এই সংঘাত শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে যখন হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর প্রতিক্রিয়ায়, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে, যার লক্ষ্য ছিল হুতিদের ক্ষমতা খর্ব করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করা। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্য, পানীয় জল এবং চিকিৎসা সেবার অভাবে ভুগছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্যোগে ইয়েমেনে একটি স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছিল। এই প্রচেষ্টা কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছিল যে, সংঘাতের একটি রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব হতে পারে। তবে হুতিদের পক্ষ থেকে আসা এই নতুন হামলার অভিযোগগুলো সেই আশাকেই নস্যাৎ করে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি কেবল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনই নয়, বরং শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলবে এবং সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে।

সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। অতীতে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে, তবে তারা সবসময়ই দাবি করেছে যে তাদের অভিযানগুলো আত্মরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হয়। এই নতুন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া কী হয়, তা দেখার বিষয়। জাতিসংঘের বিশেষ দূত এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইয়েমেনে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ তাদের কাজকে আরও কঠিন করে তোলে।

ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের ফলে দেশটির অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে গেছে এবং দুর্ভিক্ষ ও রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটলে তা এই মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করবে এবং লাখ লাখ ইয়েমেনি নাগরিকের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ করে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

বর্তমানে ইয়েমেনের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। হুতিদের এই অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয় এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না আসে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এই সংঘাত কেবল ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আঞ্চলিক ক্ষমতা ভারসাম্যের ওপরও এর বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি এবং সৌদি আরব-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে এই প্রক্সি যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এমতাবস্থায়, ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ আবারো অনিশ্চয়তার মুখে। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের এই অভিযোগগুলো শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর কালো মেঘের মতো চেপে বসেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখন গভীর উদ্বেগের সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছেন। একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অবিলম্বে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় ইয়েমেনের জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়তে থাকবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ