চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহরে আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা চাঞ্চল্যকর মামলায় ৬১ বছর বয়সী মো. মজিবর মৃধা নামের এক বৃদ্ধকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই দৃষ্টান্তমূলক রায়ের পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা এই রায় ঘোষণা করেন। তবে, রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মজিবর মৃধা আদালতে উপস্থিত ছিলেন না, যার কারণে তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মাহমুদ উল আলম চৌধুরী মারুফ সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, শিশু ধর্ষণের এই মামলায় পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত মো. মজিবর মৃধাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত মজিবর মৃধা বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দিয়াতলী এলাকার প্রয়াত কাদের মৃধার ছেলে হিসেবে পরিচিত।
মামলার নথি অনুযায়ী, মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর সকালে। সেদিন আট বছর বয়সী শিশুটির মা গৃহপরিচারিকার কাজ করার জন্য পাশের একটি বাসায় রেখে কাজে চলে যান। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আসামি মজিবর মৃধা চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে তার পাশের একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। এই পাশবিক ঘটনাটি পরবর্তীতে জানাজানি হলে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং শিশুর পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
ধর্ষণের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শিশুটির পরিবারের সদস্যরা তাকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানের পর শিশুটির মা বাদী হয়ে ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটি পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় এবং অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনার পথ প্রশস্ত হয়।
মামলা দায়েরের পর হালিশহর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জমির উদ্দীনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্র দাখিলের পর ট্রাইব্যুনালে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত সংশ্লিষ্ট সকল প্রমাণ ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে, পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং উপস্থাপিত সকল প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই রোববার আদালত এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। এই রায় সমাজে শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে এবং অপরাধীদের জন্য কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
আদালতের এই রায় শিশু সুরক্ষায় বিচার বিভাগের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। এটি কেবল একজন অপরাধীর শাস্তির বিষয় নয়, বরং সমাজে শিশুদের প্রতি সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ধরনের রায় ভবিষ্যতে এ জাতীয় অপরাধ সংঘটনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের নিরুৎসাহিত করবে এবং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।
যদিও আসামি রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না, তবে তার বিরুদ্ধে জারি করা সাজা পরোয়ানা কার্যকর করার মাধ্যমে ন্যায়বিচার সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হবে। এই রায়ের মাধ্যমে আট বছর বয়সী শিশুটির প্রতি সংঘটিত অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হলো এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।