গত শনিবার রাতে রাজধানী ঢাকার অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগ থেকে চুরি করা একটি মোবাইল ফোন ও একটি পাওয়ার ব্যাংকসহ আব্দুল কুদ্দুস (৩৮) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে এসব জিনিস উদ্ধার করেন। এই ঘটনা হাসপাতালের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা এবং রোগী ও তাদের স্বজনদের মূল্যবান জিনিসপত্রের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের প্লাটুন কমান্ডার মো. শাহাদাত হোসেন এই আটকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, গত শনিবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে নতুন ভবনের পাঁচ তলায় কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা আব্দুল কুদ্দুসের চলাফেরায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। তার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে তার দেহ তল্লাশি করা হলে একটি মোবাইল ফোন এবং একটি পাওয়ার ব্যাংক উদ্ধার করা হয়, যা পরবর্তীতে চুরি করা বলে প্রমাণিত হয়।
উদ্ধারকৃত জিনিসপত্রসহ আব্দুল কুদ্দুসকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়। ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. হাবিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আনসার সদস্যদের হাতে আটক হওয়ার পর আব্দুল কুদ্দুসকে ক্যাম্পের হেফাজতে নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে তার চুরি করার কথা স্বীকার করে। এরপর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তাকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে, যেখানে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে, বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে, চুরি ও পকেটমারির ঘটনা নতুন নয়। প্রায়শই রোগী, তাদের স্বজন অথবা হাসপাতালের কর্মীদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর সংঘবদ্ধ চক্র মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়। অসুস্থতার কারণে মনোযোগের অভাব, ভিড় এবং অপরিচিত পরিবেশে মানুষের সহজাত দুর্বলতার সুযোগ নেয় এসব অপরাধীরা। এই ধরনের ঘটনা একদিকে যেমন ভুক্তভোগীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়, তেমনি হাসপাতালের পরিবেশেও এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়।
হাসপাতাল হলো এমন একটি স্থান যেখানে মানুষ চিকিৎসা ও সেবার জন্য আসে এবং এখানে তারা নিজেদের ও তাদের প্রিয়জনদের সুরক্ষার প্রত্যাশা করে। কিন্তু যখন এমন চুরির ঘটনা ঘটে, তখন রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় এবং হাসপাতালের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়। অনেক সময় মূল্যবান জিনিসপত্র হারানোর পর চিকিৎসার খরচ মেটানো নিয়েও ভুক্তভোগীদের সমস্যায় পড়তে হয়, যা তাদের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, হাসপাতালের অভ্যন্তরে সার্বক্ষণিক সতর্কতা ও নিরাপত্তা জোরদার করা কতটা জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তার বিশাল অবকাঠামো, প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ও দর্শনার্থীর আনাগোনা এবং বহুবিধ বিভাগের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আনসার সদস্য এবং পুলিশ ক্যাম্পের নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, কিছু অপরাধী ঠিকই ফাঁকফোকর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি বৃদ্ধি, প্রবেশ ও বাহির পথে কড়া তল্লাশি, এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ওপর নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মতো পদক্ষেপগুলো আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এছাড়াও, রোগীদের ও তাদের স্বজনদের মূল্যবান জিনিসপত্র সম্পর্কে সচেতন করা এবং সতর্কতামূলক বার্তা প্রচার করাও জরুরি।
আব্দুল কুদ্দুসের আটকের ঘটনাটি হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষীদের সক্রিয় ভূমিকার একটি উদাহরণ। তবে, এই ধরনের ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা এবং সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা অপরিহার্য। আশা করা যায়, এই আটকের মাধ্যমে হাসপাতালের অভ্যন্তরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত অন্যান্যদের মধ্যে একটি সতর্কবার্তা পৌঁছাবে এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হ্রাস পাবে। পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।