ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় পূর্ব শত্রুতার জেরে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় রবিউল ইসলাম শেখ ওরফে রবি (৫৬) নামে এক চা দোকানি নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন। শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে কাশিয়ানী-আলফাডাঙ্গা সড়কের মালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। একই হামলায় নিহত রবিউলের সাথে থাকা আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
নিহত রবিউল ইসলাম শেখ আলফাডাঙ্গা উপজেলার বড়ভাগ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং পার্শ্ববর্তী কাশিয়ানী সদর বাজারে তার একটি চায়ের দোকান ছিল। তিনি প্রতিদিনের মতো দোকান বন্ধ করে আরও তিনজনের সাথে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। আহত ব্যক্তিরা হলেন একই এলাকার মোক্তার বিশ্বাস (৫৫), হৃদয় শেখ (২১) এবং লিটন খান (৪০)। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করে কাশিয়ানী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে মোক্তার বিশ্বাসের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের কাজ শেষে রবিউল ইসলাম শেখ তার পরিচিত ব্যক্তিদের সাথে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে মালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি পৌঁছালে পূর্ব থেকে ওঁত পেতে থাকা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্রের এলোপাতাড়ি কোপে ঘটনাস্থলেই রবিউল ইসলাম শেখের মৃত্যু হয়। হামলাকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের বর্বরোচিত হামলা গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে গভীর পূর্ব শত্রুতা ও গ্রাম্য বিরোধের দীর্ঘদিনের রেশ রয়েছে। এর আগে গত ২৬ জুন একই গ্রামে সুমন শেখ (৩০) নামে এক যুবককে প্রতিপক্ষের লোকজন একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। নিহত রবিউল ইসলাম শেখ ছিলেন সেই সুমন শেখের চাচা এবং এই হামলায় আহত ব্যক্তিরাও সুমনের অনুসারী বা তার পক্ষের লোক হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ববর্তী হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই এই হামলা চালানো হয়েছে, যা গ্রাম্য কলহের এক ভয়াবহ চক্রের ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের এই বিরোধের সুষ্ঠু সমাধান না হওয়ায় একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আলফাডাঙ্গাসহ আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ এমন বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন শান্তি বজায় রাখার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এবং আশ্বাস দিয়েছে যে, অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা সার্কেল) মাসুদুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি এবং জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিস্তারিত তথ্য তদন্ত শেষে জানানো হবে।” পুলিশ দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বদ্ধপরিকর বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংস ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয়। গ্রাম্য কোন্দলের জেরে বারবার রক্তপাতের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় প্রশাসনকে এই দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে। রবিউল ইসলাম শেখের আকস্মিক মৃত্যু তার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের ছায়া ফেলেছে, এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হচ্ছে।