অগণিত মানুষের হাহাকার আর সমাজের গভীর ক্ষতকে গানে রূপ দিয়ে যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছেন, সেই কিংবদন্তি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষ আজ। তিনি কেবল একজন গায়ক, গীতিকার বা সুরকার ছিলেন না; বরং ছিলেন এক মহান দ্রষ্টা, যিনি তাঁর গানের মাধ্যমে শ্রোতাকে সমাজের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতেন। তাঁর সঙ্গীত এমন এক জাদুর কাঠি, যা শ্রোতাকে নিজের অজান্তেই সমাজের ভাঙাচোরা প্রতিকৃতি দেখতে বাধ্য করে এবং সেই দৃশ্য দেখে চমকে ওঠে। তাঁর গান যেন চোখে বালুকণা পড়ার মতো অস্বস্তি সৃষ্টি করে, আবার কখনো গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে চোখ খুলে দেয়।
ভূপেন হাজারিকার গানে যেমন নদীর অবিরাম বয়ে চলা আছে, তেমনি আছে সেই নদীর দুই পারে বসবাসকারী অভাবী, ক্ষুধার্ত ও বঞ্চিত মানুষের জীবন। নাগরিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত, মৌলিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন এই মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশা নদীর স্রোতকে থামাতে পারে না, যা শিল্পীর মনে এক গভীর প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। এই প্রশ্ন কেবল নদীর প্রতি নয়, বরং আমাদের সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের প্রতি ছুড়ে দেওয়া এক অস্বস্তিকর আহ্বান – তুমি এত নির্লিপ্ত কেন? এই অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার এবং এর একটি মীমাংসার দাবি তোলার মধ্য দিয়েই ভূপেন হাজারিকা নিজেকে এক ভিন্ন মাত্রায় তুলে ধরেছেন।
আমরা সাধারণত গানকে আনন্দ-বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবেই দেখে থাকি। ভূপেন হাজারিকা সেই আনন্দকে অস্বীকার করেননি, বরং গানকে আরও গভীরতর এক ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। তিনি গানকে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সাম্য ও মানবিকতার এক শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত করেছেন। তাঁর গানে প্রেম, প্রকৃতি, বিরহ বা আনন্দ—কোনো কিছুই জীবনের রূঢ় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাঁর শিল্পযাত্রার কেন্দ্রে ছিল মানুষ, সমাজ এবং অনিবার্যভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতি নিয়ে এক নিবিড় নিনাদ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষ ক্ষুধার্ত থাকলে গান কি সেই ক্ষুধাকে এড়িয়ে যাবে? শ্রমিক তাঁর ন্যূনতম মর্যাদাটুকু না পেলে শিল্প কি শুধু সৌন্দর্যের বন্দনাই করে যাবে? রাষ্ট্র তার নাগরিকের সঙ্গে অন্যায্য করলে শিল্পী কি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকবেন, স্থাণুবৎ, প্রতিক্রিয়াহীন?
ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী গান ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে’ কেবল একটি নীতিবাক্য নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এই গানের মাধ্যমে তিনি শ্রোতার মনে সহানুভূতি জাগিয়ে তোলেন এবং একই সাথে এই পাথরকঠিন প্রশ্নও রাখেন যে, মানুষ হয়েও যদি মানুষের পাশে না দাঁড়াই, তবে মানুষ হওয়ারই-বা অর্থ কী? তাঁর মানবতাবাদ দয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, বরং তা ছিল সমমর্যাদার এক জোরালো দাবি। তাঁর গানে মানুষের অধিকারের কথা, সমতার দাবি বারবার, ঘুরেফিরে এসেছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার মধ্যে হঠাৎ এক ধাক্কার মতো এসে লাগে, যেন এক হড়পা বান।
১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সাদিয়ায় জন্ম নেওয়া ভূপেন হাজারিকা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পাঠ্যবই ছিল ‘পৃথিবী’—মানুষের জীবন এবং তাদের সংগ্রাম। দেশে ফিরে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (আইপিটিএ) যুক্ত হন, যা তাঁর শিল্পচর্চাকে আরও প্রত্যক্ষভাবে গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংযুক্ত হওয়ার রসদ জুগিয়েছিল। তিনি কেবল গান লিখতেন না, জীবনের ভাষা খুঁজতেন; লোকসুরে শুনতেন ইতিহাস, নৌকার চলনে দেখতেন জীবনযাত্রা, নদীর বয়ে চলায় দেখতেন সভ্যতার নীরব সাক্ষ্য এবং শ্রমিকের ঘামে সভ্যতা নির্মাণের কাহিনি।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ভূপেন হাজারিকার পরিচয় হয় কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কণ্ঠস্বর পল রোবসনের সঙ্গে। রোবসন শিল্পকে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে ভূপেন গভীরভাবে উপলব্ধি করেন যে, গান মানুষের কষ্টের কথা বলতে পারে, কণ্ঠ বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং সুর ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে। রোবসনের বিখ্যাত গান ‘Ol’ Man River’-এ মিসিসিপি নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শ্রম, বেদনা ও সংগ্রামের ইতিকথা, যা ভূপেনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ভূপেন হাজারিকা পল রোবসনের সেই বিখ্যাত গানকে কেবল অনুবাদ করেননি; বরং তার অন্তর্নিহিত বেদনা, প্রতিবাদ ও নদীর প্রতীকী উপস্থাপনাকে ভারতীয় বাস্তবতায় নতুন করে রূপ দিয়েছিলেন। মিসিসিপির দীর্ঘশ্বাস তাঁর গানে এসে মিশেছিল ব্রহ্মপুত্রের জলে, গঙ্গার স্রোতে, যা থেকে জন্ম নিয়েছিল ‘বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও…’ এর মতো কালজয়ী গান। তিনি বৈশ্বিক বঞ্চনার আখ্যানকে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন, যা তাঁর গানকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ভূপেন হাজারিকা তাঁর গানের মাধ্যমে যে সামাজিক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন, তা আজও মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর গান কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, এটি একটি সামাজিক দলিল, যা মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং মানুষকে তার মৌলিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জন্মশতবর্ষে এই মহান শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর মধ্য দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকর্মের চিরন্তন আবেদনকে নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।