কিংবদন্তি রকস্টার আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ 'উত্তরাধিকার' প্রকল্প আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট শিল্পীর জন্মদিনে এই প্রকল্পটি বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হলেও, মাত্র সাতটি গান প্রকাশের পরই এটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। শ্রোতাদের আপত্তির মুখে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা চারটি প্রকাশিত গান সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে, বাকি ১৩টি অপ্রকাশিত গানও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে, যা আইয়ুব বাচ্চু ভক্তদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্ত সঙ্গীত জগতে আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টিকর্মের প্রতি ভক্তদের গভীর আবেগেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
'রূপালি গিটার', 'নীল বেদনা', 'মাধবী', 'সেই তুমি' এবং 'কষ্ট পেতে ভালোবাসি'-এর মতো আইয়ুব বাচ্চুর অসংখ্য জনপ্রিয় গানকে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশনের লক্ষ্য নিয়ে 'উত্তরাধিকার' যাত্রা শুরু করেছিল। আটটি ব্যান্ড ও বারো জন স্বতন্ত্র শিল্পী এই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। যদিও শুরুতে সিডি আকারে অ্যালবাম প্রকাশের পরিকল্পনা ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত স্পটিফাই, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গানগুলো উন্মুক্ত করা হয়। প্রথম গান হিসেবে বাপ্পা মজুমদারের কণ্ঠে 'রূপালি গিটার' প্রকাশিত হয়। এরপর একে একে সোনার বাংলা সার্কাসের কণ্ঠে 'গতকাল রাতে', কানিজ সুবর্ণার কণ্ঠে 'কষ্ট পেতে ভালোবাসি', জয় শাহরিয়ারের কণ্ঠে 'কষ্ট কাকে বলে', পলাশের কণ্ঠে 'আপন কেহ নাই', অটামনাল মুনের কণ্ঠে 'হকার' এবং অদিত-এর কণ্ঠে 'ঘুমন্ত শহরে' গানগুলো মুক্তি পায়।
তবে, বাপ্পা মজুমদার, সোনার বাংলা সার্কাস এবং পলাশের গাওয়া গান তিনটি তুলনামূলকভাবে কম সমালোচিত হলেও, বাকি চারটি গান নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। আইয়ুব বাচ্চুর ভক্তরা নতুন গায়কী এবং সংগীতায়োজন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, মূল গানগুলোর আত্মা ও মেজাজকে সঠিকভাবে ধারণ করা হয়নি, যা কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টির প্রতি এক প্রকার অবমূল্যায়ন। এই সমালোচনা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের উপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হন। ভক্তদের এই প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে, আইয়ুব বাচ্চু কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে এক গভীর আবেগ ও ভালোবাসার নাম।
ব্যাপক সমালোচনার মুখে 'উত্তরাধিকার' প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কয়েক দফা জরুরি আলোচনায় বসেন। এই আলোচনার ফলস্বরূপ, গত রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকার ধানমন্ডির একটি কফি শপে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সকল অংশীজনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকেই সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ইতোমধ্যে প্রকাশিত চারটি বিতর্কিত গান ইউটিউব, স্পটিফাইসহ সকল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা বাকি ১৩টি গানও আপাতত স্থগিত রাখা হবে। এই সিদ্ধান্তটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সকলের জন্য একটি কঠিন পদক্ষেপ হলেও, আইয়ুব বাচ্চুর বিশাল ভক্তগোষ্ঠীর আবেগকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেই এটি নেওয়া হয়েছে।
আইয়ুব বাচ্চুর দীর্ঘদিনের সহযাত্রী এবং তার ব্যান্ড এলআরবি’র অন্যতম সদস্য শামীম আহমেদ এই প্রসঙ্গে বলেন, "বস (আইয়ুব বাচ্চু) আমাদের সবার কাছে একটি আবেগের ব্যাপার। তার কালজয়ী সৃষ্টিকে কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা যায় না, এই বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন।" তিনি আরও জানান, শিগগিরই আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের সকল সদস্যের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং তাদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হবে। এই প্যানেল যদি গানগুলোকে সঠিকভাবে মূল্যায়িত মনে করে, কেবল তখনই সেগুলোর ভবিষ্যৎ প্রকাশ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি নিশ্চিত করে যে, ভবিষ্যতে যেকোনো পদক্ষেপে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের সম্মতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রকল্পটি স্থগিত হওয়ার বিষয়ে আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তারও তার সম্মতি জানিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, 'উত্তরাধিকার' প্রকল্পটি বর্তমানে স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শিল্পী ও কলাকুশলী তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, আইয়ুব বাচ্চুকে ভালোবেসেই তারা এই গানগুলো তৈরি করেছিলেন, এটি ছিল তাদের পক্ষ থেকে কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাদের দাবি, এই প্রকল্প থেকে তারা কেউই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হননি। তাদের মতে, গান ভালো না লাগার অধিকার সবার আছে, কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর গান কেউ গাইতে পারবেন না এমনটা বলা এক প্রকার উগ্রবাদী আচরণ। তারা আরও জানান, প্রকল্প থেকে অর্জিত অর্থ আইয়ুব বাচ্চু মিউজিয়াম তৈরিতে ব্যয় করার পরিকল্পনা ছিল, যা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
সামগ্রিকভাবে, 'উত্তরাধিকার' প্রকল্পের এই আকস্মিক স্থগিতাদেশ বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টিকর্মকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে মূল শিল্পীর মেজাজ ও ভক্তদের আবেগকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা নিয়ে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। আইয়ুব বাচ্চুর অগণিত ভক্তরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে তার গানগুলো এমনভাবে পরিবেশিত হবে, যা তার মূল সৃষ্টিকে সম্মান জানাবে এবং তার উত্তরাধিকারকে সযত্নে সংরক্ষণ করবে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গীতপ্রেমীরা তাদের প্রিয় শিল্পীদের প্রতি কতটা সংবেদনশীল এবং তাদের সৃষ্টিকে কতটা গুরুত্ব দেন।