সোমবার, 24 আগস্ট 2026
⚠ ব্রেকিং
সংগীত 🇧🇩 বাংলা
🌐 এই সংবাদটি English এও পাওয়া যাচ্ছে 🇬🇧 Read in English

ছায়ানটের বিশ্বব্যাপী সংগীত শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সুযোগ

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট তাদের সংগীত শিক্ষা কার্যক্রমকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে 'প্রবাসী ও ঢাকার বাইরের সংগীতানুরাগীদের জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণ' নামের একটি নতুন উদ্যোগ, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদেরও ছায়ানটের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

শেয়ার করুন:
ছায়ানটের বিশ্বব্যাপী সংগীত শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সুযোগ

বাংলাদেশের সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম পীঠস্থান ছায়ানট তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সংগীত শিক্ষা কার্যক্রমকে এবার আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত করেছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী এবং সংগীতানুরাগীদের জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করেছে এই প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান। ১৬ আগস্ট ২০২৬, রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'প্রবাসী ও ঢাকার বাইরের সংগীতানুরাগীদের জন্য অনলাইন প্রশিক্ষণ' নামের এই বিশেষ কার্যক্রমের শুভ সূচনা হয়েছে। এর ফলে, আগ্রহীরা এখন আর ধানমন্ডির কার্যালয়ে না এসেও বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ছায়ানটের মানসম্মত সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন, যা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

এই যুগান্তকারী অনলাইন কার্যক্রমের সূচনা উপলক্ষে রোববার বিকেলে ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনকেন্দ্রে একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ছায়ানটের নিজস্ব সাংগীতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়, সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় সমবেত কণ্ঠে 'মানুষ হ, মানুষ হ, আবার তোরা মানুষ হ' গানটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। এই পরিবেশনা উপস্থিত সকলের মধ্যে এক ভিন্ন আমেজ তৈরি করে এবং ছায়ানটের মূল চেতনার সঙ্গে নতুন উদ্যোগের গভীর সংযোগ তুলে ধরে। অনুষ্ঠানটি ছিল একাধারে তথ্যবহুল এবং ঐতিহ্যমণ্ডিত, যা ছায়ানটের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকেই প্রতিফলিত করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছায়ানটের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং এই অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষকরা। এতে বক্তব্য রাখেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী, সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা এবং ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনের নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ সেলিনা মালেক চৌধুরী। এছাড়া, অনলাইন সংগীত শিক্ষার চার অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক শিল্পী শারমিন সাথী ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস ও টিংকু কুমার শীলও উপস্থিত ছিলেন। তাদের সম্মিলিত উপস্থিতি এই নতুন উদ্যোগের গুরুত্ব এবং এর বাস্তবায়নে ছায়ানটের অঙ্গীকারকে স্পষ্ট করে তোলে।

সংবাদ সম্মেলনে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা এই অনলাইন কার্যক্রমের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি জানান, এতদিন ছায়ানটের সংগীত শিক্ষা কার্যক্রম মূলত ঢাকার ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশে বসবাসকারী অগণিত সংগীতানুরাগী চাইলেও ছায়ানটের এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিতে পারতেন না। ২০১৪ সালে 'সহস্র কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশন' আয়োজনের মধ্য দিয়ে ছায়ানটের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর বিভিন্নমুখী উদ্যোগ ও নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে ডিজিটাল মাধ্যমে ছায়ানটের সক্ষমতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলস্বরূপ এখন সংগীত শিক্ষা কার্যক্রমকে বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারিত করার এই মহৎ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

নতুন এই অনলাইন প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপ 'সংগীত-পরিচয়' শিরোনামে প্রতি রোববার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত পরিচালিত হবে। এই কার্যক্রমে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত এবং লোকসংগীতের মৌলিক শিক্ষা প্রদান করা হবে। কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই ব্যাপক সাড়া মিলেছে, যেখানে ইতিমধ্যে বয়সভেদে 'শিশু-কিশোর' এবং 'সাধারণ' এই দুটি শাখায় মোট ১২১ জন শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছেন; যেমন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১২ জন, ইউরোপ থেকে ৭ জন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে মোট ৯ জন এবং দেশের অভ্যন্তর থেকে ৯৩ জন সংগীতানুরাগী এই কার্যক্রমে যোগ দিয়েছেন, যা এর বৈশ্বিক আবেদনকে প্রমাণ করে।

প্রাথমিক পর্যায়ের পর, অনলাইন কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ হিসেবে 'নিবিড় শিক্ষণ' শুরু হবে, যা অগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এই নিবিড় শিক্ষণ কার্যক্রমে দেশের তিন গুণী শিল্পী ও শিক্ষক সংগীত শেখাবেন: লোকসংগীতের জন্য কিরণ চন্দ্র রায়, নজরুলসংগীতের জন্য খায়রুল আনাম শাকিল এবং রবীন্দ্রসংগীতের জন্য লাইসা আহমদ লিসা। এই উন্নত পর্যায়ের ক্লাস আগামী ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আগ্রহীরা ছায়ানটের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে এই কার্যক্রম সংক্রান্ত সকল বিস্তারিত তথ্য ও আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারবেন, যা তাদের জন্য আরও সহজবোধ্য হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ছায়ানট বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন মেয়াদের কার্যক্রমে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করছেন। তিনি এই নতুন অনলাইন উদ্যোগকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন, যার মাধ্যমে ছায়ানটের সংগীত শিক্ষা কার্যক্রম ভবনের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সারা দেশ এবং বিশ্বব্যাপী এক বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত হলো। এটি শুধু ছায়ানটের জন্যই নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এক অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বলে তিনি উল্লেখ করেন, যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ