রাজধানীর সংস্কৃতি অঙ্গনে এক ভিন্ন মেজাজের শ্রাবণসন্ধ্যা উপভোগ করলেন দর্শক-শ্রোতারা। গত ৮ই আগস্ট, ২০২৬ তারিখে ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনে গান, নৃত্য আর আবৃত্তির মধ্য দিয়ে পালিত হলো ‘বর্ষামুখর শ্রাবণসন্ধ্যা’ নামের এক গীতিনৃত্য-আলেখ্য। প্রয়াত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও শিক্ষক সাদি মহম্মদের হাতে গড়া গানের দল ‘ভোরের আলো’ এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের সূত্রপাত ঘটায়। তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে ছিল সংগীত সংগঠন গানে গানে আড্ডা (ছোটদের দল), উত্তরায়ণ এবং নৃত্যসংগঠন নৃত্যাঞ্চল।
প্রকৃতির ঋতুচক্রে বর্ষা বাংলার জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রীষ্মের তপ্ত শুষ্কতাকে দূর করে বর্ষার অবিরাম বারিধারা শুধু মাটিকে সিক্ত ও উর্বরই করে না, বরং প্রকৃতিকে নবজীবন দান করে। এই নবীনতা ও সজীবতা কবিদের মনেও গভীর রেখাপাত করে, তাদের চিত্তে জাগিয়ে তোলে সৃষ্টির ব্যাকুলতা। বৃষ্টিস্নাত বৃক্ষলতা যেমন নতুন পত্রপল্লবে সবুজ সজীব হয়ে ওঠে, তেমনি কবিরাও বর্ষার প্রেরণায় নতুন নতুন কাব্য, সংগীত, নাটকসহ অজস্র রচনায় বর্ষার বন্দনায় নিজেদের উৎসর্গ করেন।
বিশেষত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাব্য ও সংগীতে বর্ষাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টির বিশাল সম্ভারেই যেন বর্ষা নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই কালজয়ী সৃজনসম্ভারকে উপজীব্য করেই সাজানো হয়েছিল ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনের এই বিশেষ শ্রাবণসন্ধ্যার আয়োজন। শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে প্রকৃতির এই অপরূপ ঋতুকে স্মরণ করেন, যা দর্শক-শ্রোতাদের মনকে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত ‘আহ্বান আসিল মহোৎসব/ অম্বরে গম্ভীর ভেরিরবে’ গানটির মধ্য দিয়ে, যা উপস্থিত সকলের মনে এক উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয়। এরপর ‘আজ তালের বনের করতালি’ গানটির সঙ্গে ছিল সমবেত সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা, যা মিলনায়তনকে প্রাণবন্ত করে তোলে। ফারজানা অপরাজিতা তাঁর একক কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা’ গানটি, যা শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে। এর পরপরই ‘গহন ঘন ছাইল/ হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু’ গানের সঙ্গে পরিবেশিত হয় এক মনোমুগ্ধকর সমবেত নৃত্য, যা বর্ষার গভীরতা ও রহস্যময়তাকে ফুটিয়ে তোলে।
কোনো বিরতি ছাড়াই পুরো অনুষ্ঠানটি একক ও সমবেত গান, নৃত্য এবং আবৃত্তির মধ্য দিয়ে অনবদ্য গতিতে এগিয়ে চলে। একক কণ্ঠের পরিবেশনার মধ্যে আরও ছিল ‘গগনে গগনে আপন মনে’, ‘চিত্ত আমার হারাল’, ‘শাওন গগনে’ এবং ‘আজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে’র মতো জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত। এই গানগুলোতে অনুপম কুমার পাল, জেসমিন রোজ, মৌমিতা পাল, সৌরভ শিকদার প্রমুখ শিল্পীরা তাঁদের সুমধুর কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। অনুষ্ঠানের আবৃত্তি পর্বে অনন্যা সাহা ও হাফিজুর রহমান তাঁদের অনবদ্য পাঠ ও আবৃত্তির মাধ্যমে বর্ষার কবিতা ও বাণীকে নতুন করে উপস্থাপন করেন।
নৃত্য পরিবেশনার মধ্যে ‘আষাঢ় কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া’ গানের সঙ্গে ছিল সমবেত নৃত্য, যা বর্ষার আগমনী বার্তা এবং প্রকৃতির আনন্দকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে। এছাড়া, সমবেত গানের মধ্যে আরও ছিল ‘এসো এসো ওগো শ্যামছায়া ঘন দিন’, ‘তিমির অবগুন্ঠনে’, ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ এবং ‘আজি বর্ষারাতের শেষ’ সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান, যা বর্ষার বিভিন্ন মেজাজ ও রূপকে প্রকাশ করে। প্রতিটি পরিবেশনাই ছিল শিল্পীদের নিপুণতা ও ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে ‘মরু বিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ’ এই সমবেত কণ্ঠের গানটি দিয়ে, যা এক নতুন উদ্দীপনা ও আশার বার্তা নিয়ে আসে। এই আয়োজন কেবল বর্ষাকে স্মরণ করা নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি মানুষের চিরন্তন ভালোবাসা এবং শিল্পের মাধ্যমে সেই ভালোবাসার প্রকাশকেও উদযাপন করে। পুরো ‘বর্ষামুখর শ্রাবণসন্ধ্যা’ অনুষ্ঠানটির সার্বিক পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী লিলি ইসলাম। নৃত্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী শিবলী মোহাম্মদ ও স্নাতা শাহরিন, যাদের সুদক্ষ নির্দেশনায় প্রতিটি নৃত্য পরিবেশনাই হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়।