দীর্ঘ ১০ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মঞ্চে আবারও সুরের মূর্ছনা ছড়ালেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা। গত শনিবার সন্ধ্যায় সিডনির নরওয়েস্ট কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত 'বাংলাদেশ নাইট ২০২৬' অনুষ্ঠানে প্রায় দুই হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁকে একনজর দেখতে এবং সরাসরি গান শুনতে জড়ো হয়েছিলেন। মঞ্চে তাঁর আবির্ভাবে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান, যা এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দেয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন এই জীবন্ত কিংবদন্তি, যার উপস্থিতি পুরো মিলনায়তনকে এক ভিন্ন মাত্রার আনন্দোৎসবে পরিণত করে।
৭৩ বছর বয়সেও রুনা লায়লা তাঁর চিরচেনা দরদ, গায়কি এবং কণ্ঠের শক্তিশালী জাদুতে একের পর এক জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন। তাঁর কণ্ঠের মায়াবী স্পর্শে দর্শকেরা যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর প্রতিটি গানের সঙ্গে গলা মেলান। বিশেষ করে, অনুষ্ঠানের শেষ দিকে তিনি যখন তাঁর বহুল জনপ্রিয় 'দমাদম মাস্ত কালান্দার' পরিবেশন করেন, তখন করতালি, শিস এবং দর্শকদের সম্মিলিত উচ্ছ্বাসে পুরো মিলনায়তন যেন এক বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে। অনেকেই তখন আর আসনে বসে থাকতে পারেননি, উল্লাসে ফেটে পড়েন তাঁরা।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যেমন বড় বড় কনসার্ট ঘিরে দর্শকের আগ্রহ ও উন্মাদনা বেড়েছে, তেমনি দেশের বাইরেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বৃহৎ পরিসরের সাংস্কৃতিক আয়োজনের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার ধারাবাহিকতায় 'লিসেন ফর'-এর ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত 'বাংলাদেশ নাইট ২০২৬' সিডনির প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এক অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাংলাদেশ থেকে শিল্পী, যন্ত্রী ও কলাকুশলী মিলিয়ে মোট ২৫ সদস্যের একটি বিশাল দল এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়, যা আয়োজনের ব্যাপকতা ও গুরুত্ব তুলে ধরে। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপনা করেন প্রিয়তা ইফতেখার।
সন্ধ্যার শুরুতেই মঞ্চে ওঠেন জনপ্রিয় শিল্পী পিন্টু ঘোষ। তাঁর পরিবেশনায় ছিল বৈচিত্র্যময় সুরের আবহ; 'পিঁপড়া', 'যাদুর শহর' এবং ভাষা আন্দোলনের স্মারক গানসহ একের পর এক পরিবেশনায় তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করেন। পিন্টু ঘোষের পরিবেশনা শেষ হওয়ার পর সংগীত পরিচালক ও শিল্পী ইমন চৌধুরী 'বেঙ্গল সিম্ফনি'কে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে আসেন। এসরাজের সুরে শুরু হওয়া তাঁর পরিবেশনায় ছিল লোকসংগীত, আধুনিক গান ও ফিউশনের এক অনবদ্য মেলবন্ধন, যা দর্শকদের ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা প্রদান করে। পরবর্তী পর্বে আলেয়া বেগম, মিঠুন চক্র ও এরফান মৃধা শিবলুও তাঁদের স্বতন্ত্র পরিবেশনা উপহার দেন।
সব শেষে মঞ্চে আবির্ভূত হন রুনা লায়লা, যিনি যেন দর্শকদের তাঁর ছয় দশকেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ সংগীতভ্রমণে নিয়ে যান। তিনি একে একে পরিবেশন করেন 'শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব', 'যখন থামবে কোলাহল', 'বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম, দেখা পাইলাম না' সহ তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গান। প্রতিটি গানের সঙ্গেই দর্শকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গলা মেলান এবং উন্মাদনায় মেতে ওঠেন। তবে 'দমাদম মাস্ত কালান্দার' পরিবেশনার সময় উচ্ছ্বাস ছিল সবচেয়ে বেশি, যা এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে। রুনা লায়লার ছয় দশকের বেশি সময়ের সংগীতজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন অভিনেত্রী নাজনীন নীহা।
এই আয়োজনে শুধু মঞ্চের পরিবেশনাই নয়, মিলনায়তনের বাইরেও ছিল বিশেষ আকর্ষণ। রুনা লায়লার বিভিন্ন সময়ের বিখ্যাত অ্যালবামের ভিনাইল রেকর্ড, আলোকচিত্র ও স্মৃতিচিহ্ন দিয়ে সাজানো হয়েছিল একটি স্মারক দেয়াল। পুরো সন্ধ্যা জুড়ে সেই দেয়ালের সামনে ছিল দর্শকের উপচে পড়া ভিড়। অনেকেই ছবি তুলে এই স্মরণীয় মুহূর্তটিকে ধরে রাখেন। এছাড়া, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্য থেকে নতুন কণ্ঠ খুঁজে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছিল 'সিং উইথ লায়লা' প্রতিযোগিতা। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন প্রতিযোগীর মধ্য থেকে রুনা লায়লা নিজেই বিজয়ী হিসেবে ইলোরা খানকে নির্বাচন করেন। পরে ইলোরা খান তাঁর সঙ্গে একই মঞ্চে কণ্ঠ মিলিয়ে পরিবেশন করেন কালজয়ী গান 'যে জন প্রেমের ভাব জানে না', যা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা ছিল।
বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিজ্ঞ সাউন্ড প্রকৌশলী শামীম হোসেনের মতে, দেশের বাইরে বাংলাভাষী কোনো কমিউনিটির জন্য এটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ও আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক আয়োজন। দর্শক ফারহানা হাসান তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, 'পিন্টু ঘোষের পরিবেশনা আর বাউল গানের সিম্ফনি দারুণ লেগেছে। রুনা লায়লা মঞ্চে উঠতেই পুরো হলের মানুষ যেভাবে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালেন—সেই মুহূর্তটির কথা ভুলব না। এই বয়সেও তিনি যেভাবে “দমাদাম মাস্ত কালান্দার” গাইলেন, আমরা এক কথায় মুগ্ধ।'
সিডনিপ্রবাসী অভিনেতা মাজনুন মিজান এই আয়োজনকে কেবল একটি কনসার্ট নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'অনেক দিন পর এত বড় হলে এমন একটি নান্দনিক ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে এত মানুষ একসঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতি উদ্যাপন করল। প্রতিবছর প্রবাসে এমন আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন হলে বিশ্বদরবারে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।' প্রবাসী লেখক আরিফুর রহমান 'লিসেন ফর'-এর আয়োজনের পেশাদারত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, 'দেশ থেকে এত বড় টিম এনে এমন জটিল আয়োজন নির্বিঘ্নে শেষ করা সত্যিই প্রশংসনীয়। গত এক দশকে প্রবাসের মাটিতে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম সেরা আয়োজন ছিল, যা প্রবাসীদের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।'