ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের দুটি বিভাগের পরীক্ষার ফল প্রায় সাত মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো প্রকাশিত হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, কারণ ফল প্রকাশের আগেই তারা তৃতীয় বর্ষের ইনকোর্স ও টেস্ট পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। উদ্ভিদবিদ্যা এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থীরা এই ফল বিপর্যয়ের শিকার, যারা এখনো জানেন না তারা দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হয়েছেন নাকি অকৃতকার্য হয়েছেন।
জানা গেছে, এই দুই বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি। প্রায় সাত মাস ধরে অপেক্ষার পরও ফলাফল না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তারা বলছেন, ফল প্রকাশে এমন বিলম্ব তাদের শিক্ষাজীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, পরবর্তী বর্ষের পরীক্ষার প্রস্তুতি, ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষা দেওয়া বা রিটেক সংক্রান্ত কোনো বিষয়েই তারা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, যদি ফল প্রকাশের আগেই তৃতীয় বর্ষের মূল পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে। ঢাকা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন তার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ফল প্রকাশ না হলে আমরা কীভাবে বুঝবো যে ইমপ্রুভমেন্ট দিতে হবে কি না? প্রতিটি পরীক্ষার পরই ফল খারাপ হওয়ার একটা স্বাভাবিক আশঙ্কা থাকে। আমাদের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে, অথচ দ্বিতীয় বর্ষের মূল ফলই এখনো প্রকাশ করা হয়নি।”
উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী তৌসিফ খান একই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “আমাদের দ্বিতীয় বর্ষের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি, অথচ যেকোনো সময় তৃতীয় বর্ষের মূল পরীক্ষার নোটিশ জারি হতে পারে। এতে আমরা চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছি। আমাদের তৃতীয় বর্ষের টেস্ট পরীক্ষাও শেষ, অর্থাৎ এখন সরাসরি ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার কথা। কিন্তু আগের বছরের ফল না পাওয়ায় আমরা আদৌ পরবর্তী বর্ষে উত্তীর্ণ হয়েছি কি না, সেটিই নিশ্চিত নই।”
এই ফল প্রকাশের বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান বিথিয়া সঞ্চিতা সমাদ্দার জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা নিয়মিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, গত সপ্তাহেও এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ দ্রুত ফল প্রকাশের চেষ্টা করছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা তিনি জানাতে পারেননি।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান এনামুল কবির মিয়া ফল বিলম্বের কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেন। তিনি জানান, অনেক সময় কোনো শিক্ষক খাতা মূল্যায়ন করে বিদেশে চলে গেলে বা ফিরতে দেরি হলে এমন জটিলতা তৈরি হয়। এছাড়া, এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং অধিভুক্ত কলেজের প্রতিনিধি ড. নাজমুল হুদা আকস্মিকভাবে মারা গেছেন। সম্প্রতি নতুন একজন তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যা প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে কিছুটা দীর্ঘায়িত করতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বলেন, ফল আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে না আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে কোনো দিন বলা সম্ভব নয়। তবে কমিটির সভাপতির সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানা গেছে, তিনি যত দ্রুত সম্ভব ফল জমা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই মন্তব্যে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি হতাশ হয়েছেন, কারণ এতে কোনো সুনির্দিষ্ট আশার আলো দেখা যায়নি।
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের কথা বিবেচনা করে এই ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত নিরসন হওয়া উচিত। ফল প্রকাশে এমন দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে এবং তাদের একাডেমিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি করছে।