জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) দেশের অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে প্রায় ৯৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ১২টি নতুন এবং সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিকীকরণের জন্য তিনটি নতুন মেট্রোরেল লাইন স্থাপনের প্রকল্প বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। এই বিশাল বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করার সরকারের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
একনেক, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম হিসেবে পরিচিত, নিয়মিতভাবে দেশের বৃহৎ আকারের উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ পর্যালোচনা ও অনুমোদন করে থাকে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা। এবারের বৈঠকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে মেগাসিটি ঢাকার জন্য অত্যাধুনিক পরিবহন সমাধান, তেমনি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক খাতগুলো। এই সমন্বিত উদ্যোগ দেশের সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই প্রকল্পগুলো ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ ও আরামদায়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যাপক সহায়ক হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই নতুন লাইনগুলো ঢাকার উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করবে, যা বর্তমান মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে। এর ফলে শহরের লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত সহজ হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।
মেট্রোরেল প্রকল্প ছাড়াও, অনুমোদিত অন্যান্য নয়টি প্রকল্প দেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে কিছু রয়েছে গ্রামীণ সড়ক ও সেতু নির্মাণ ও সংস্কার, নদী ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও বিদ্যমানগুলোর আধুনিকীকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য নতুন হাসপাতাল ও ক্লিনিক নির্মাণ। এসব প্রকল্প দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একনেক কর্তৃক অনুমোদিত এই প্রকল্পগুলোর মোট প্রাক্কলিত ব্যয় সরকারের নিজস্ব তহবিল, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে নির্বাহ করা হবে। এই বিপুল বিনিয়োগ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যাতে প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে ও বাজেটের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এই প্রকল্পগুলো সরকারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা, যেমন 'ভিশন ২০৪১' এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার লক্ষ্য পূরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্পগুলো একনেকের লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। বিশেষ করে, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। এটি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব বৃহৎ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান সামগ্রিকভাবে উন্নত করবে। বিশেষ করে, মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ঢাকার মতো জনবহুল শহরের জন্য অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।