রাজশাহীর ক্রীড়াঙ্গনে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে এক মহাপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বহুমুখী ক্রীড়া উন্নয়ন এবং নতুন নতুন টুর্নামেন্ট আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের খেলাধুলাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) বিকেলে রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের গ্র্যান্ড ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমিমন্ত্রী এসব ঘোষণা দেন, যা রাজশাহীর ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু তাঁর বক্তব্যে খেলাধুলার সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, নতুন প্রজন্মকে মাদকাসক্তি, মোবাইল আসক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। তরুণদের মেধা ও মননশীলতার পরিপূর্ণ বিকাশে ক্রীড়া চর্চার ভূমিকা অপরিসীম। এ কারণেই রাজশাহীর ক্রীড়াঙ্গনকে আরও গতিশীল করতে সরকার বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তিনি খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেন, খেলায় হার-জিত স্বাভাবিক ঘটনা, তবে সবচেয়ে বড় জয় হবে রাজশাহীর এবং সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের ক্রীড়াঙ্গনের।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও একজন ক্রীড়ামোদী এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে চাঙ্গা করতে তিনি খেলোয়াড়দের মাঠে ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদানকারী নতুন প্রজন্ম যেন মাদক, মোবাইল আসক্তি এবং অন্যান্য সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে, সেটিই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণে ক্রীড়া খাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামের উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন ভূমিমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজশাহীর এই ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন স্টেডিয়ামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মাঠ সংস্কারের পাশাপাশি দ্রুত ফ্লাডলাইটগুলো সচল করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এই মাঠে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবল দলের পাশাপাশি দেশের কয়েকটি জাতীয় ক্রিকেট দলের অংশগ্রহণে বড় ধরনের টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে রাজশাহী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মানচিত্রে আরও উজ্জ্বলভাবে স্থান করে নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মহানগরীর খেলার মাঠগুলোর দুরবস্থা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, রাজশাহী মহানগরীতে প্রায় ১৬টি ছোট-বড় মাঠ রয়েছে, যার অনেকগুলোই দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বর্তমানে খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে দ্রুত এসব মাঠ সংস্কার করে সুন্দর ও সবুজ খেলার উপযোগী মাঠ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়াও, রাজশাহীর ক্রীড়াঙ্গনকে আরও প্রাণবন্ত করতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও টুর্নামেন্ট আয়োজনের ঘোষণা দেন তিনি। এর মধ্যে রাজশাহী শহরের কলেজ ও স্কুলগুলোতে বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে ‘ভলিবল গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট’ এবং ভবিষ্যতে ‘প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ’ সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচটি টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে দুর্গাপুর উপজেলা দলকে পরাজিত করে মোহনপুর উপজেলা দল চ্যাম্পিয়ন হয়। গত ২২ আগস্ট শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ভূমিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন দুর্গাপুর উপজেলা দলের পলাশ, ফাইনাল ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন একই দলের জুবায়ের। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন মোহনপুর উপজেলা দলের বাদল এবং সেরা গোলকিপারের পুরস্কার পেয়েছেন মোহনপুর উপজেলা দলের আবু রায়হান।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবা হাবিবা, বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী, আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবীর এবং পুলিশ সুপার মো. মামুন অর রশিদ। এছাড়াও, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা, খেলোয়াড়, দর্শক, সুধীজন ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন, যা এই আয়োজনের গুরুত্ব ও ব্যাপকতা প্রমাণ করে।
ভূমিমন্ত্রীর এই ঘোষণা রাজশাহীর ক্রীড়া মহলে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। আশা করা হচ্ছে, এসব বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজশাহী আবারও তার হারানো ক্রীড়া গৌরব ফিরে পাবে এবং তরুণ প্রজন্ম সুস্থ ও গঠনমূলক কার্যক্রমে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে উৎসাহিত হবে। সরকারের এই সদিচ্ছা ও পরিকল্পনা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী ক্রীড়া অবকাঠামো তৈরিতে সহায়ক হবে, যা দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।