বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এক বিশাল চোরাচালানবিরোধী অভিযানে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মিয়ানমারে পাচারকালে বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করেছে। দেশের কৃষিখাতের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই পণ্য অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের প্রাক্কালে উদ্ধার হওয়ায় সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিজিবির দৃঢ় অঙ্গীকার আবারও প্রমাণিত হলো। গত ১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর, এই দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে মোট ৪ হাজার ৪০১ কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য পাঁচ লাখ এক হাজার আটশত দশ টাকা।
কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি)-এর অধীনস্থ বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) এই অভিযান পরিচালনা করে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, বাইশফাঁড়ি, চাকঢালা এবং রেজুপাড়া সীমান্ত এলাকায় বিজিবি’র আভিযানিক দল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোয়েন্দা তথ্য ও নিজস্ব নজরদারির ভিত্তিতে এই সাফল্য অর্জন করে। এই সুদীর্ঘ অভিযানকালে চোরাকারবারীদের বিভিন্ন কৌশল ও পথ ব্যবহার করে সার পাচারের চেষ্টা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। জব্দকৃত সারের মধ্যে ইউরিয়া এবং টিএসপি উভয় প্রকার সারই ছিল, যা দেশের কৃষিজমিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানান। তিনি এই প্রসঙ্গে সারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সার দেশের কৃষি উৎপাদনের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। এর অবৈধ পাচার দেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।” তার এই মন্তব্য দেশের কৃষিখাতের প্রতি সরকারের এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গভীর মনোযোগের ইঙ্গিত দেয়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এর অপচয় রোধ করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সীমান্ত দিয়ে সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের অবৈধ পাচার কেবল দেশের আর্থিক ক্ষতিই করে না, বরং স্থানীয় বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের ভোগান্তির কারণ হতে পারে। যখন দেশের অভ্যন্তরে কৃষকদের জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, তখন এ ধরনের পাচার কার্যক্রম সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়, তেমনই অন্যদিকে কৃষকরা উচ্চমূল্যে সার কিনতে বাধ্য হন অথবা সময়মতো সার না পেয়ে ফসল উৎপাদনে পিছিয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল খায়রুল আলম আরও জানান, সারসহ সব ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রিত পণ্যের অবৈধ পাচাররোধে বিজিবি সর্বদা সতর্ক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান দমনে বিজিবি’র গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন। বিজিবি’র এই কঠোর অবস্থান চোরাকারবারীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা যে, বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ কার্যকলাপ বরদাশত করা হবে না।
বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা বরাবরই চোরাচালানের জন্য সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত। বিশেষত মিয়ানমার সীমান্তের এই অঞ্চল দিয়ে মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের অবৈধ আদান-প্রদান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিজিবি নিয়মিতভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। কেবল সার নয়, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাচার রোধেও বিজিবি সদস্যরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য, আর এই লক্ষ্য অর্জনে তারা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি’র এই ধরনের অভিযান নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। তবে চোরাচালান পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। সারের মতো কৃষিপণ্যের পাচার রোধের মাধ্যমে দেশের কৃষি অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই অভিযান একদিকে যেমন চোরাকারবারীদের উৎসাহিত করবে না, তেমনই অন্যদিকে দেশের কৃষকদের মনে আস্থা যোগাবে যে, সরকার তাদের স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর। বিজিবি’র এই নিরন্তর প্রচেষ্টা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।