শুক্রবার, 11 সেপ্টেম্বর 2026
⚠ ব্রেকিং
ফুটবল 🇧🇩 বাংলা

বুন্দেসলিগার গোলমেশিন হ্যারি কেইন: লেভানডফস্কির রেকর্ড ভাঙা কেন ‘মিশন ইম্পসিবল’?

বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে একের পর এক গোল করে চলেছেন ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন, কিন্তু বুন্দেসলিগায় রবার্ট লেভানডফস্কির এক মৌসুমে ৪১ গোলের রেকর্ড ভাঙা তার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক জার্মান মিডফিল্ডার ডিটমার হামান আধুনিক ফুটবলের বাস্তবতা তুলে ধরে এই কীর্তিকে ‘মিশন ইম্পসিবল’ আখ্যা দিয়েছেন।

শেয়ার করুন:
বুন্দেসলিগার গোলমেশিন হ্যারি কেইন: লেভানডফস্কির রেকর্ড ভাঙা কেন ‘মিশন ইম্পসিবল’?

জার্মান বুন্দেসলিগায় বায়ার্ন মিউনিখের জার্সি গায়ে হ্যারি কেইন যেন এক অপ্রতিরোধ্য গোলমেশিন। ইংলিশ এই স্ট্রাইকার টটেনহামের ট্রফি-খরা পেছনে ফেলে বাভারিয়ার সবুজ ঘাসে একের পর এক গোল করে চলেছেন, আর জিতে চলেছেন ব্যক্তিগত শিরোপাও। তার আগমন জার্মান ফুটবলে এক নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে, যেখানে রেকর্ড ভাঙার গল্প নতুন নয়। তবে, রবার্ট লেভানডফস্কির এক মৌসুমে ৪১ গোলের সেই রূপকথার রেকর্ড ভাঙাটা কেইনের জন্য কতটা সম্ভব, তা নিয়ে ফুটবল মহলে চলছে জোর আলোচনা, আর কিছু বিশেষজ্ঞের মতে এটি এক প্রকার ‘মিশন ইম্পসিবল’।

বায়ার্নের জার্সিতে ১৪৯ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে কেইন নিজের জাত চিনিয়েছেন। ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার এরই মধ্যে টানা তিন মৌসুম বুন্দেসলিগার গোল্ডেন বুট জিতেছেন, যা তার ধারাবাহিকতার প্রমাণ। বুন্দেসলিগায় ১০০ গোলের মাইলফলকের খুব কাছাকাছি (৯৫ ম্যাচে ৯৮ গোল) দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বিগত দুই মৌসুমে তিনি যথাক্রমে ৩৬টি করে গোল করেছেন, যা লেভানডফস্কির রেকর্ড থেকে মাত্র চার-পাঁচ গোল দূরে। তার এমন অসাধারণ পারফরম্যান্স সত্ত্বেও, সাবেক জার্মান মিডফিল্ডার ডিটমার হামান মনে করেন, লেভানডফস্কির সেই একক মৌসুমে ৪১ গোলের রেকর্ড ভাঙা কেইনের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে রেকর্ড ভাঙাটা সবসময়ই এক বিশাল ব্যাপার। গার্ড মুলারের ৩৬৫ গোল কিংবা এক মৌসুমে ৪০ গোলের রূপকথা কয়েক দশক ধরে অলঙ্ঘনীয় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন সেই অচলায়তন হয়তো কখনো ভাঙবে না। কিন্তু ২০২০-২১ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের পোলিশ গোলমেশিন রবার্ট লেভানডফস্কি যখন বুন্দেসলিগায় ৪১টি গোলের ইতিহাস লিখলেন, তখন জার্মান ফুটবল সাক্ষী হয়েছিল এক নতুন ইতিহাসের। সেই ইতিহাসের হাতছানি নিয়েই বায়ার্নে পা রেখেছিলেন হ্যারি কেইন, কিন্তু লেভানডফস্কি যে উচ্চতা স্থাপন করেছেন, তা ছুঁতে পারা সহজ নয়।

ফুটবল ওয়েবসাইট ‘গোল’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিটমার হামান কেইনের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সংশয় প্রকাশ করেননি। তবে তিনি আধুনিক ফুটবলের সূচি এবং পরিস্থিতির বাস্তবতাকেই এই রেকর্ড ভাঙার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হামান বলেছেন, “৪০-৫০ বছর ধরে ওই রেকর্ড টিকে ছিল। সবাই বলত এটা ভাঙা অসম্ভব। কিন্তু লেভানডফস্কি গিয়ার বদলে মুলারকে এক গোলে টপকে গেলেন। কেইন টানা দু-তিনটি চমৎকার মৌসুমে অনেক গোল করেও সেই রেকর্ডের চার-পাঁচ গোল দূরে আটকে গেছেন।” তার মতে, কেইনের মতো একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ।

হামান লেভানডফস্কির রেকর্ড কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে তার একটি সহজ হিসাব কষেছেন। তার মতে, লিগে এত বড় মাইলফলক ছুঁতে হলে অন্তত ৩০ থেকে ৩২টি ম্যাচের পুরো সময় খেলতে হয়। কিন্তু ইউরোপের রাজত্ব দখলের লড়াই যেখানে বায়ার্নের প্রধান লক্ষ্য, সেখানে কেইনকে সব ম্যাচে খেলানোর ঝুঁকি বায়ার্ন নেবে না। চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল বা সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে লিগের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কেইনকে বিশ্রাম দেওয়াই স্বাভাবিক। এতে তার খেলার সময় কমে যাবে, যা সরাসরি গোলসংখ্যায় প্রভাব ফেলবে।

হামান আরও যোগ করেন, “যদি বায়ার্ন চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে অনেক দূর যায়, তবে নিশ্চিতভাবেই লিগের অন্তত দু-তিনটি ম্যাচে সে খেলবে না বা বদলি হিসেবে নামবে। তবে তারা যদি গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিত, যা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তবে হয়তো কেইনের সম্ভাবনা থাকত। তবে বাস্তবতা হলো কেইনের এই বয়সে চ্যাম্পিয়নস লিগের বাড়তি চাপের মধ্যে বায়ার্ন তাঁকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেবে না।” তার স্পষ্ট কথা, “সে পারবে কি না? অবশ্যই তার সেই সামর্থ্য আছে। কিন্তু আমি মনে করি, সে পারবে না।” আধুনিক ফুটবলের পেশাদারিত্বে দলের সাফল্যই ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।

তবে এক মৌসুমে ৪১ গোলের রেকর্ড না হলেও, অন্য এক জায়গায় লেভানডফস্কিকে স্পর্শ করার বড় সুযোগ রয়েছে কেইনের সামনে। বায়ার্নের সঙ্গে বর্তমান চুক্তির শেষ বছরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ইংলিশ স্ট্রাইকার নতুন চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছেন বলেই খবর। যদি তিনি আগামী দু-তিন বছর বায়ার্নে থাকেন এবং ফিট থাকেন, তবে লেভানডফস্কির টানা পাঁচবার গোল্ডেন বুট জেতার কীর্তিতে ভাগ বসানো কেইনের জন্য স্রেফ সময়ের ব্যাপার। হামানও এই বিষয়ে আশাবাদী, “সে যদি ফিট থাকে, তাহলে প্রতি মৌসুমেই ২০ থেকে ২৫ গোল ধরেই শুরু করে। এরপর যেটা করবে, সেটা বাড়তি। আমি এমন কোনো পরিস্থিতি দেখি না, যেখানে সে ২০ গোল করবে না। আর বেশির ভাগ সময়েই এই সংখ্যাই গোল্ডেন বুট জিততে যথেষ্ট।”

তবে সামনে আরও বড় লক্ষ্যও আছে। বায়ার্নের হয়ে লেভানডফস্কি করেছেন ৩৪৪ গোল। এই ক্লাবের হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড এখনো গার্ড মুলারের সেই ৩৬৫ গোল। সেই উচ্চতায় যেতে হলে কেইনকে আরও বেশ কয়েক বছর মিউনিখে থাকতে হবে এবং তার বর্তমান গোল করার হার ধরে রাখতে হবে। হ্যারি কেইনের অদম্য গোল করার ক্ষমতা এবং বায়ার্নের সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা, এই দুইয়ের মেলবন্ধন তাকে ভবিষ্যতে আরও অনেক রেকর্ডের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। সময় হয়তো বলবে, কেইন সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যের পেছনে ছোটেন কি না এবং জার্মান ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নাম আরও কত উঁচুতে স্থাপন করেন।

শেয়ার করুন:
সম্পর্কিত সংবাদ